অর্থ কি আসলেই অনর্থের মূল
আমরা কথায় কথায় বলে থাকি, ‘অর্থই অনর্থের মূল’। বাস্তবে এ ধরনের প্রবাদবাক্যের কোনো যৌক্তিকতা নেই। কারণ অর্থ ছাড়া আমাদের একমুহূর্তও চলে না। অর্থ ছাড়া পৃথিবী অচল। বর্তমান বাস্তবতা হচ্ছে, সমাজ-সংসারে তারই মূল্যায়ন হয়, যার হাতে বিস্তর অর্থ থাকে। আর্থিক সামর্থ্যহীন মানুষের কোনো মূল্যায়ন হয় না। অর্থই হচ্ছে জাগতিক শক্তির উৎস। কাজেই অর্থ কখনোই অনর্থের মূল হতে পারে না, যদি তা সৎভাবে সঠিক পথে উপার্জিত হয়। অর্থ যদি অনৈতিক পথে অবৈধভাবে উপার্জিত হয়, তখন তা সমাজের জন্য বিপদের কারণ হতে পারে।
এক সময় বিশ্বের সর্বত্রই পণ্য বিনিময় প্রথা প্রচলিত ছিল। বাজারে একজন মানুষ তার উপার্জিত অথবা তার অধিকারে থাকা পণ্যের বিনিময়ে তার চাহিদাকৃত পণ্য অন্য একজনের কাছে নিয়ে যেত। এভাবেই পণ্য বিনিময় প্রথা চলে আসছিল। কিন্তু এতে একটি বড় ধরনের অসুবিধার সৃষ্টি হতো। দুজন পণ্য বিক্রেতার চাহিদার মধ্যে সমন্বয় সাধন করা কঠিন হতো। যেমন, একজন নারিকেল বিক্রেতা হয়তো নারিকেলের বিনিময়ে আলু ক্রয় করতে চান; তাহলে তাকে এমন একজন ব্যক্তিকে খুঁজে বের করতে হতো যিনি আলুর বিনিময়ে নারিকেল ক্রয় করতে চান। যদি আলু বিক্রেতা আলুর বিনিময়ে নারিকেল না কিনে পটোল ক্রয় করতে চান, তাহলে তাদের মধ্যে পণ্য বিনিময় সম্ভব হতো না। এ সমস্যা সমাধানের জন্যই একসময় পণ্য বিনিময়ের মাধ্যম হিসাবে মুদ্রাব্যবস্থা চালু করা হয়। মূল্যবান ধাতু, যার সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা আছে যেমন-স্বর্ণমুদ্রা, রৌপ্যমুদ্রা বা ব্রঞ্জমুদ্রার মাধ্যমে বাজারে পণ্য বিনিময় কার্যক্রম পরিচালিত হতো। আমাদের দেশে কঁড়ির বিনিময়েও বাজারে পণ্য ক্রয়-বিক্রয় হতো।
বিশ্বে প্রথম পণ্য বিনিময় প্রথা কখন শুরু হয়, তা সঠিকভাবে জানা সম্ভব হয়নি। তবে কোনো কোনো সূত্র দাবি করে, বিনিময় প্রথা থেকে ধাতব মুদ্রার ব্যবহার শুরু হয় খ্রিষ্টপূর্ব ৭০০ থেকে ৬০০ অব্দের মধ্যে। বর্তমান তুরস্কের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য লুডিয়াতে বিশ্বের প্রথম আনুষ্ঠানিক ধাতব মুদ্রা তৈরি ও ব্যবহৃত হয়েছিল বলে জানা যায়। এর অনেক দিন পর নবম শতাব্দীতে চীনে প্রথম কাগজের মুদ্রার প্রচলন হয়। উপমহাদেশে ধাতব মুদ্রার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক লেনদেন শুরু হয় খ্রিষ্টপূর্ব ৬ষ্ঠ থেকে ৫ম শতাব্দীতে। প্রাচীন বাংলার মহাস্থানগড় ও নরসিংদীর উয়ারী-বটেশ্বর অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ রুপার পঞ্চ-মার্কড মুদ্রা ও ছাঁচে ঢালা তামার মুদ্রা আবিষ্কৃত হয়েছে। এ থেকে প্রতীয়মান হয়, খ্রিষ্টপূর্ব ৪র্থ এবং তৃতীয় শতাব্দী এবং মৌর্য সাম্রাজ্যের সময়কালেই সমগ্র বাংলাদেশে ব্যবসায়িক লেনদেনের উদ্দেশ্যে ধাতব মুদ্রার ব্যবহার শুরু হয়।
পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে বিনিময় প্রথা চালু থাকাকালীন বাজারে ক্রেতা-বিক্রেতার চাহিদার মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান বা সমন্বয় সাধনের ক্ষেত্রে যে অসুবিধা হচ্ছিল, তা মুদ্রা আবিষ্কারের ফলে দূর হয়। কিন্তু সমস্যা সৃষ্টি হয় অন্যত্র এবং এ সমস্যা দিন দিন মারাত্মক জটিল আকার ধারণ করছে। তা হলো, অবৈধভাবে অর্থ তথা সম্পদ অর্জনের লালসা। পণ্য বিনিময় প্রথা চালু থাকাকালে মানুষ বাজারে গিয়ে তার চাহিদাকৃত পণ্যসামগ্রীই শুধু ক্রয় করত। তারা সম্পদ জমিয়ে রাখার তেমন কোনো চেষ্টা করত না। আর যেসব পণ্য বিনিময় করা হতো, তার বেশির ভাগই পচনশীল বা স্বল্পস্থায়ী। ফলে কেউ এগুলো জমিয়ে রাখার চেষ্টা তেমন একটা করত না। তারা তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য যতটুকু পণ্য প্রয়োজন, শুধু সেটুকুই ক্রয় করত। কিন্তু মুদ্রা বিনিময় প্রথা চালু হওয়ার পর মানুষের মধ্যে অর্থ বা মুদ্রা জমিয়ে রাখার প্রবণতা শুরু হয়।
মুদ্রা জমানোর এ সীমাহীন খায়েশ থেকেই শুরু হয় অর্থ পাচারের প্রবণতা। কারণ কোনো দেশেই অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থ ব্যবহারের অবাধ সুযোগ দেওয়া হয় না। বরং যারা অবৈধ অর্থের মালিক ও ব্যবহারকারী, তাদের নানাভাবে রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে জবাবদিহি করতে হয়। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, অর্থ পাচার উন্নত দেশের তুলনায় অনুন্নত দেশ থেকে বেশি হয়। অবৈধভাবে উপার্জিত হলেও যে অর্থ স্বদেশের উন্নয়ন বা কল্যাণে ব্যবহৃত হতে পারত, পাচারের কারণে সেই অর্থ অন্য দেশের উন্নয়নে ব্যয়িত হচ্ছে। অর্থ পাচারকারীরা তাদের অর্থের পরিমাণ ও উৎস কারও কাছে প্রকাশ করে না। এছাড়া পাচারকৃত অর্থের হিসাব বা পরিসংখ্যান সংরক্ষণের জন্য কোনো বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানও নেই। ফলে প্রতিবছর বিশ্বে কী পরিমাণ অর্থ পাচার হয়, তার সঠিক পরিসংখ্যান কারও পক্ষে প্রদান করা সম্ভব নয়। তবে জাতিসংঘ ড্রাগস অ্যান্ড ক্রাইম অফিসের মতে, প্রতিবছর বিশ্বে যে পরিমাণ অর্থ পাচার হয়, তার পরিমাণ বিশ্ব জিডিপির ২ থেকে ৫ শতাংশ, টাকার অঙ্কে যার পরিমাণ ৮০ হাজার কোটি মার্কিন ডলার থেকে ২ লাখ কোটি ডলারের সমান। কোনো কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার মতে, বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর যে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হয়, টাকার অঙ্কে তা ২ ট্রিলিয়ন থেকে ৪ ট্রিলিয়ন ডলার অতিক্রম করে যায়। আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইনটিগ্রিটির (জিএফআই) মতে, উন্নয়নশীল দেশ থেকে প্রতিবছর গড়ে ১ ট্রিলিয়ন ডলার পাচার হয়। পাচারকৃত অর্থের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই উন্নত দেশগুলোর ব্যাংকে সংরক্ষণ করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা এসব দেশের পুঁজিবাজার এবং আবাসন খাতে বিনিয়োগ করা হয়। প্রাপ্ত পরিসংখ্যান থেকে একটি বিষয় অত্যন্ত পরিষ্কার তা হলো, বর্ণিত আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থ পাচারের যে পরিসংখ্যান প্রদান করেছে, তার সবই অনুমাননির্ভর। তাদের দেওয়া পরিসংখ্যানের মধ্যে তথ্যের ফারাক বড়ই বেশি।
- ট্যাগ:
- মতামত
- অর্থ আয়
- পণ্য বিনিময়