টোকিওর স্বপ্ন, ঢাকার বিবেক

প্রথম আলো ঢাকা মেট্রোপলিটন মহিউদ্দিন আহমদ প্রকাশিত: ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ১৩:২৫

টোকিওর আকাশে তখন শরতের মৃদু রোদ। গিঙ্কোগাছের পাতায় সোনালি আলো ঝরে পড়ছে, যেন ঋতু নিজেই নগরীর কাঁধে একটি রেশমি চাদর জড়িয়ে দিয়েছে। সেই দূরদেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বললেন, ঢাকাকেও টোকিওর মতো সুন্দর, পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।


কথাটি সংবাদপত্রের একটি শিরোনাম হয়তো। কিন্তু তার গভীরে ছিল আরও বড় কিছু। ছিল একটি নগরসভ্যতার প্রশ্ন, একটি জাতির আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন। কারণ, শহর কেবল নির্মাণ করা যায় না, তাকে লালনও করতে হয়।


একটি গোলাপগাছের কাছে যেমন শুধু মালিই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন ঋতুর অনুকম্পা, মাটির উর্বরতা, শিশিরের স্পর্শ; তেমনি একটি শহরকে সুন্দর রাখার জন্য শুধু সরকারের উদ্যোগ নয়, প্রয়োজন নাগরিকের ভালোবাসা। আর ভালোবাসাহীন সৌন্দর্য খুব বেশি দিন টেকে না।


ঢাকা শহরকে আমি অনেক সময় এক ক্লান্ত মায়ের সঙ্গে তুলনা করি। ভোর হতে না হতেই সে জেগে ওঠে। তার বুকে লাখো মানুষের পদচারণ। তার কপালে যানজটের চিন্তার ভাঁজ। তার চোখের কোণে ধুলো জমে। তার ফুসফুসে বিষাক্ত ধোঁয়া। তার নদীগুলোয় ক্লান্তির কালো জল। তবু সে বেঁচে থাকে। প্রতিদিন। প্রতিটি সকাল। প্রতিটি সন্ধ্যা। যেন সন্তানদের জন্য দুঃখ গোপন করে রাখা কোনো জননীর মতো। কিন্তু সেই মায়ের মুখে যদি আমরা প্রতিদিনই ধুলো ছুড়ে দিই, তার আঁচলে যদি আমরা নিজেরাই ময়লা মুছি, তবে তাকে দোষ দিয়ে আর কত দূর যাওয়া যায়?


ভোরবেলায় শহরের রাস্তায় হাঁটলে দেখা যায়, কিছু মানুষ নিঃশব্দে দিন শুরু করে। গত রাতের জমানো ধুলো সরায়। পাতা সরায়। পলিথিন সরায়। বোতল সরায়। শহরের শরীর ধুয়ে দেয় নিজের শ্রমের ঘামে।


সূর্য ওঠে। মানুষ বের হয়। আর দুপুর না হতেই সেই একই রাস্তায় আবার উড়ে এসে পড়ে প্লাস্টিকের কাপ, চিপসের মোড়ক, সিগারেটের প্যাকেট। তারা কিছু বলে না। কিন্তু বাতাস যেন তাদের হয়ে প্রশ্ন করে, ‘আমরা কি রাস্তা পরিষ্কার করছি, নাকি মানুষের অভ্যাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছি?’ এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের প্রত্যেককেই দিতে হবে।


আমরা প্রায়ই বলি, টোকিও পরিষ্কার। সিঙ্গাপুর পরিচ্ছন্ন। সিউল সুসংগঠিত। কিন্তু এই শহরগুলোর গল্প শুধু উন্নত অর্থনীতির গল্প নয়। এগুলো মানুষের চরিত্রের গল্প। নাগরিক চেতনার গল্প। আত্মশাসনের গল্প।


জাপানের একজন মানুষ রাস্তার ওপর ময়লা ফেলেন না কেবল জরিমানার ভয়ে নয়; তিনি ফেলেন না কারণ শহরটিকে তিনি নিজের সম্প্রসারিত ঘর বলে মনে করেন। এ অনুভূতিই সভ্যতার সবচেয়ে বড় সম্পদ। যেখানে নাগরিক বলে, ‘এই রাস্তা আমার’, ‘এই ফুটপাত আমার’, ‘এই পার্ক আমার’, ‘এই নদী আমার’, সেখানে শহর ধীরে ধীরে সুন্দর হয়ে ওঠে। শাসকের নির্দেশে নয়, মানুষের মমতায়।


আসলে শহরকে সুন্দর রাখা কোনো প্রকৌশলগত সমস্যা নয়। এটি একধরনের নৈতিক কবিতা। একধরনের সামাজিক সংগীত, যার প্রতিটি পঙ্‌ক্তি লিখতে হয় মানুষের আচরণ দিয়ে। একটি শিশু যখন চকলেটের মোড়ক রাস্তায় না ফেলে পকেটে রাখে, তখন সে একটি পরিচ্ছন্ন শহরের জন্য একটি লাইন লেখে। একজন তরুণ যখন দেয়ালে পোস্টার না লাগানোর সিদ্ধান্ত নেয়, তখন সে আরেকটি লাইন লেখে। একজন দোকানি যখন দোকানের সামনের ময়লা নিজে পরিষ্কার করে, তখন সে সেই কবিতায় আরও একটি শব্দ যোগ করে। এভাবেই একটি নগরীর সৌন্দর্য রচিত হয়। ধীরে ধীরে। নীরবে। গভীরে।


আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল হয়তো এখানেই। আমরা মনে করি, শহর সরকারের। অথচ সত্য হলো, শহর কারও একার নয়। এটি এক বিশাল যৌথ উত্তরাধিকার, যার মালিক একসঙ্গে রিকশাচালকও, অধ্যাপকও; শ্রমিকও, মন্ত্রীও। সরকার রাস্তা বানাতে পারে। ফুটপাত নির্মাণ করতে পারে। পার্ক গড়ে তুলতে পারে। আইন প্রণয়ন করতে পারে। কিন্তু মানুষের বিবেক নির্মাণ করার ক্ষমতা কোনো রাষ্ট্রের নেই। সেটি জন্ম নেয় পরিবারে। সেটি বড় হয় স্কুলে। সেটি বিকশিত হয় সংস্কৃতিতে। আর পরিণত হয় ব্যক্তির চরিত্রে।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও