বিচারহীনতার দশ বছর: সাঁওতালদের ভিটা বাগদাফার্মে কার স্বার্থে ইপিজেড?

বিডি নিউজ ২৪ খোকন সুইটেন মুর্মু প্রকাশিত: ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ১৩:২৩

“এই দেশের বিচার ভালো নয় রে, এই দেশের মানুষ ভালো নয়।


এই দেশের দিকু-ঠাকুর, বেজায় ঠকের ঠক রে,


এই দেশের মান ভালো নয়।”


“এই দেশের বিচার ভালো নয় রে”—সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্মের সহিংসতার স্মরণে আয়োজিত সমাবেশগুলোতে সাঁওতালরা এই আক্ষেপের গান গেয়ে থাকেন। ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর যেসব নারী তাদের স্বামী ও ভাইকে হারিয়েছেন, তাদের কাছে এই গান একই সঙ্গে শোক ও প্রতিবাদের ভাষা। দশম বার্ষিকীকে সামনে রেখে তাদের প্রশ্নটি আজও গভীর বেদনার: যে জমিতে একটি জনগোষ্ঠী এখনো ন্যায়বিচার ও পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে, সেখানে কীভাবে ইপিজেড করার মতো নতুন একটি উন্নয়ন প্রকল্পের পরিকল্পনা করা হয়?


২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলায় সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্মে উচ্ছেদের চেষ্টাকে কেন্দ্র করে সাঁওতাল অধিবাসী, পুলিশ, চিনিকলের শ্রমিক ও স্থানীয় লোকজনের মধ্যে সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটে। এতে তিন সাঁওতাল পুরুষ—মঙ্গল মার্ডি, রমেশ টুডু ও শ্যামল হেমব্রম নিহত হন। অন্তত ৩০ জন সাঁওতাল আহত হন এবং তাদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়, চালানো হয় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ। বহু পরিবার এলাকাটি থেকে বাস্তুচ্যুত হয়। এই ঘটনা সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর মনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বলপ্রয়োগ, বসতবাড়ি ধ্বংস এবং ভূমির অধিকারের দাবিদার মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দেয়।


দশ বছর পেরিয়ে গেলেও জবাবদিহি ও ন্যায়বিচারের মূল দাবি এখনো পূরণ হয়নি। অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ২০২৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়ে অভিযোগকারীরা তদন্তের বিষয়ে আপত্তি জানান। তাদের দাবি, তদন্তে সহিংসতার সঙ্গে জড়িত গুরুত্বপূর্ণ অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বাদ দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী সময়ে মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য পাঠানো হয়। নবম বার্ষিকী উপলক্ষে প্রকাশিত এবং ২০২৬ সালের অগাস্টে হালনাগাদ করা এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে আদালত অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দিলেও হালনাগাদ তদন্ত প্রতিবেদন তখনো জমা দেওয়া হয়নি। ফলে মামলার বিচারকাজও শুরু হয়নি। দীর্ঘদিনের এই অনিশ্চয়তা নিহতদের পরিবারগুলোর দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে তুলছে এবং সবার জন্য সমান ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার বিষয়ে জনসাধারণের আস্থা দুর্বল করছে।


সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্মের ইতিহাস থেকে এই সহিংসতাকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার সুযোগ নেই। সাঁওতাল জনগোষ্ঠী ও ক্ষতিগ্রস্ত অন্যান্য কৃষকের দাবি, রংপুর চিনিকলের জন্য জমি অধিগ্রহণের সময় নির্দিষ্ট শর্ত ছিল—জমি অধিগ্রহণের ঘোষিত উদ্দেশ্যেই ব্যবহার করতে হবে এবং সেই উদ্দেশ্য আর বহাল না থাকলে জমি মূল মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে। তাদের অভিযোগ, পরবর্তী সময়ে চিনিকল কর্তৃপক্ষ সাঁওতালদের পূর্বপুরুষের ভিটে মাটি আর ফসলের ওই জমির কিছু অংশ প্রভাবশালী স্থানীয় ব্যক্তিদের কাছে ইজারা দেয়; অথচ মূল ভূমিমালিকদের কাছে তা ফিরিয়ে দেওয়া হয়নি। চিনিকল বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং পরবর্তী ভূমিবিরোধের কারণে সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলো নিজেদের ভূমির অধিকারের স্বীকৃতি আদায়ের সংগ্রামে আটকে রয়েছে। এসব ভূমির দাবি নিয়ে বিরোধ রয়েছে, যা স্বচ্ছ ও আইনসম্মত প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি করতে হবে। নতুন কোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে কেবল বাধা হিসেবে বিবেচনা করে এই বিরোধ এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।


সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্মে একটি রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল (ইপিজেড) প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব সাঁওতালদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ ও আশঙ্কা সৃষ্টি করেছে। সাঁওতালদের ভিটা সাহেবগঞ্জ বাগদাফার্মে কার স্বার্থে এই ইপিজেডের পরিকল্পনা? সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর কাছে প্রশ্নটি শুধু এই নয় যে একটি ইপিজেড কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারবে কি না, করলে বিনিয়োগ আকর্ষণ করবে কি না। বরং মূল প্রশ্ন হলো, যেখানে হত্যাকাণ্ডের বিচার শুরু হয়নি এবং ভূমির বিরোধের নিষ্পত্তি হয়নি, সেখানে রাষ্ট্র কীভাবে একটি বড় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে পারে? সাঁওতাল সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা বারবার বলেছেন, প্রকল্পের প্রস্তাব এগিয়ে নেওয়ার আগে তাদের সঙ্গে অর্থবহ কোনো পরামর্শ করা হয়নি। তাদের আশঙ্কা, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে পূর্বপুরুষের জমি ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা আরও ক্ষীণ হয়ে যাবে এবং ইতিমধ্যে বসতভিটা, জীবিকা ও নিরাপত্তা হারানো পরিবারগুলো আরও প্রান্তিক হয়ে পড়বে।


বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিল্পায়ন সম্প্রসারণের জাতীয় স্বার্থ অবশ্যই রয়েছে। কিন্তু যারা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া থেকে বাদ দিয়ে কিংবা কোনো প্রতিকার ছাড়াই উন্নয়নের মূল্য তাদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। পরামর্শ গ্রহণের প্রক্রিয়া হতে হবে প্রকল্পের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেই, অর্থবহ এবং এমন ভাষা ও পদ্ধতিতে, যা ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠী সহজে বুঝতে পারে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে স্বীকৃত আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্বাধীন ও পূর্বাবোহিত সম্মতি (Free, Prior and Informed Consent—FPIC) নীতি এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো প্রদান করে। এই নীতি অনুযায়ী, সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীকে প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে হবে, তাদের স্বাধীনভাবে আলোচনা ও মতামত প্রদানের প্রকৃত সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে এবং তাদের উদ্বেগগুলো শুধু নথিভুক্ত করলেই চলবে না, সেগুলোর যথাযথ সমাধানও করতে হবে।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও