জাপানের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে জাপান সফর করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দায়িত্ব গ্রহণের পর মালয়েশিয়া ও চীন সফরের পর এটি তার তৃতীয় বিদেশ সফর। এ সফরকে কেন্দ্র করে অনেক সম্ভাবনার আকাঙ্ক্ষা রয়েছে বাংলাদেশের জন্য। প্রধানমন্ত্রীর এ জাপান সফরকে অবশ্যই স্বাগতম জানাই। কেননা জাপান আমাদের বিশ্বস্ত ও অকৃত্রিম বন্ধু রাষ্ট্র। জাপান আমাদের অতীতে অনেক সাহায্য করেছে, খুবই অল্প সুদে ঋণ দিয়েছে আমাদের অবকাঠামো গড়ে তোলার জন্য।
বর্তমানে দেশের শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান বাড়াতে জাপানি বিনিয়োগ দরকার। অটোমোবাইল, জ্বালানি, প্রযুক্তি, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও শিল্প উৎপাদনসহ বিভিন্ন খাতে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। তবে এসব বিনিয়োগে উৎপাদিত পণ্যকে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ড হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। দেশে কিংবা বিদেশে-যেখানেই বিক্রি হোক, পণ্যটি বাংলাদেশের উৎপাদিত পণ্য হিসাবে পরিচিতি পাবে। প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরকে কেন্দ্র করে এমনই একটি সম্ভাবনার কথা শোনা যাচ্ছে, সেটা হলো, জাপানি বিনিয়োগে বাংলাদেশে বিশ্বমানের গাড়ি তৈরি হবে। বিশ্ববাজারে ছড়িয়ে পড়বে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ড। টয়োটার মতো বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগে দেশে গাড়ি উৎপাদন শুরু হলে গড়ে উঠবে হাজারো সহযোগী শিল্প, আসবে নতুন বিনিয়োগ, বাড়বে কর্মসংস্থান। একই সঙ্গে জাপানি প্রযুক্তি ও বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের যৌথ উদ্যোগে দেশের শিল্পায়নে খুলবে নতুন দরজা।
জাপানি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশি উদ্যোক্তারা বড় শিল্পে যুক্ত হতে পারবেন। বিশ্বজুড়েই জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে কাজ করে। একটি গাড়ি তৈরিতে প্রায় ৩ হাজার ৩০০ ধরনের যন্ত্রাংশ প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশে টয়োটা গাড়ি উৎপাদন শুরু হলে এসব যন্ত্রাংশ তৈরিতে অসংখ্য পশ্চাৎ-সংযোগ শিল্প বা ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ গড়ে ওঠার যথেষ্ট সুযোগ তৈরি হবে। এতে নতুন বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও কর্মসংস্থান বাড়বে। একই সঙ্গে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডের গাড়ি দেশের চাহিদা মিটিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও রপ্তানি করা সম্ভব হবে। এটা বাংলাদেশের জন্য খুবই আশার একটি খবর।
একটি জাতীয় দৈনিক থেকে জানতে পারলাম, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ৩৫০টি জাপানি প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কিন্তু দেশে জাপানের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ এখনো ৫০ কোটি ডলারের নিচে। অর্থাৎ জাপানি প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি থাকলেও বাংলাদেশের শিল্প ও রপ্তানি খাতে তাদের বিনিয়োগ আরও বাড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ গত অর্থবছরে জাপানে ১৩৬ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে; বিপরীতে আমদানি করেছে ২১৬ কোটি ডলারের পণ্য। এ ব্যবধান কমাতে রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি ও দেশে উৎপাদন সম্প্রসারণ জরুরি। জাপানি বিনিয়োগের সম্ভাব্য নতুন ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে অটোমোবাইল শিল্প বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। বাংলাদেশে গাড়ি উৎপাদন কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনার কথা টয়োটা ইতোমধ্যে সরকারকে জানিয়েছে। পূর্ণ উৎপাদন ২০২৯ সালের মধ্যে শুরু করার লক্ষ্য রয়েছে। তবে কারখানাটির বিনিয়োগের অঙ্ক, উৎপাদন সক্ষমতা, নির্দিষ্ট মডেল ও চূড়ান্ত বাস্তবায়ন পরিকল্পনা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি।
জাপানের বৈদেশিক বাণিজ্য সংস্থা জেট্রোর বাংলাদেশ প্রতিনিধি কাজুইকি কাতাওকার তথ্য অনুযায়ী, টয়োটা সুসো করপোরেশন ঢাকা ও চট্টগ্রামে বিক্রয়, সার্ভিস এবং খুচরা যন্ত্রাংশের দুটি কেন্দ্রে প্রায় চার কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে। এসব কেন্দ্রের নির্মাণকাজ নভেম্বরেই শুরু হওয়ার কথা। পাশাপাশি জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে হাইব্রিড বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদনকেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এর উন্নয়নকাজ ২০২৭ সালে শুরু এবং ২০২৯ সালে পূর্ণ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর