সৎ, সাহসী, সুসাংবাদিকতা, বাংলাদেশের মানুষের এবং বাংলাদেশের জয়ের প্রত্যয় নিয়ে ১৯৯৮ সালের ৪ নভেম্বর যাত্রা শুরু করেছিল প্রথম আলো। নানা চড়াই–উতরাই পেরিয়ে আজ প্রথম আলো ২৮ বছর পূর্ণ করল। বাংলাদেশের মতো দেশ, যেখানে গণমাধ্যমকে প্রতিনিয়ত রাজনৈতিক, সামাজিক ও নানা গোষ্ঠীর চাপে পিষ্ট হতে হয়, সেখানে প্রথম আলো ২৮ বছর ধরে তার মূল্যবোধ ও অবস্থানে অটল থেকেই পথ চলছে। এই বন্ধুর ও অমসৃণ যাত্রাপথে দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষ, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ীরাই আমাদের শক্তি ও সাহস।
শুরু থেকেই প্রথম আলো দলনিরপেক্ষ সাংবাদিকতা এবং স্বাধীন মতপ্রকাশের চর্চা করে এসেছে। শুধু কাগজে–কলমে নয়, বিশ্বাস ও চর্চায় এই মূল্যবোধের অটল অবস্থানের কারণে প্রথম আলো দ্রুতই দেশের সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিকের মর্যাদা পায়। তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশ ও ডিজিটাল রূপান্তরের সঙ্গী হয়ে প্রথম আলো ওয়েবসাইট বাংলাভাষীদের মধ্যে শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে। দীর্ঘ এই যাত্রাপথে প্রথম আলো অনেকগুলো মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক পুরস্কার ও স্বীকৃতি পেয়েছে।
বাংলাদেশের মতো অস্থিতিশীল গণতন্ত্র ও রাজনৈতিকভাবে মেরুকৃত একটি সমাজে সত্যের প্রতি অবিচল থাকা অত্যন্ত কঠিন ও চ্যালেঞ্জের। সংবাদমাধ্যমের মূল কাজই ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা। এ কারণে গত ২৮ বছর সব সরকারের আমলেই প্রথম আলোকে ক্ষমতাসীনদের বিরাগভাজন হতে হয়েছে। বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেওয়া, পত্রিকা বিতরণে বাধা, মামলা করা, সাংবাদিকদের গ্রেপ্তার থেকে শুরু করে নানা ধরনের নিগ্রহের শিকার হয়েছে প্রথম আলো ও প্রথম আলোর সাংবাদিকেরা। ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর রাতে প্রথম আলো কার্যালয়ে সন্ত্রাসী হামলা চালানো হয়। নজিরবিহীন এই হামলা থেকে বোঝা যায়, বাংলাদেশে স্বাধীন মতপ্রকাশের বিপদ কতটা গভীর। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা শুধু সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার নয়, এটি নাগরিকের জানার অধিকার এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহির অন্যতম পূর্বশর্ত।
এটি অনস্বীকার্য যে প্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতি তথ্যপ্রবাহকে সহজ ও দ্রুত করেছে। একই সঙ্গে সাংবাদিকতা ও সংবাদমাধ্যমের সামনে তৈরি করেছে নতুন ও জটিল চ্যালেঞ্জ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার, অপতথ্যের ছড়াছড়ি ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি—সব মিলিয়ে দেশের গণমাধ্যম এখন এক বিশৃঙ্খল ও বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর প্রভাব শুধু সংবাদমাধ্যমের ব্যবসা ও পেশাদার সাংবাদিকদের ওপর সীমাবদ্ধ থাকছে না; গণতন্ত্র, জনমত গঠন এবং নাগরিকের তথ্য জানার অধিকারের ওপরও পড়ছে। আমরা মনে করি, মূল্যবোধে অটল থেকে স্বাধীন ও সৎ সাংবাদিকতার চর্চা করে যাওয়াটাই এই সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ।
- ট্যাগ:
- মতামত
- গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা