অতি সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর জানিয়েছেন, ব্যাংকিং খাতের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে আগামী পাঁচ থেকে আট বছরে জাতীয় বাজেট থেকে প্রতিবছর ৬০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। তিনি অবলীলায় স্বীকার করেন যে তাঁর দায়িত্ব নেওয়ার পর দেখা গেছে, ব্যাংকের তিন ভাগের এক ভাগ টাকা চুরি করে নিয়ে গেছে কিছু লোক। তিনি এটাকে ঠিক চুরি বলতে চান না, এটাকে লুট বলাই সংগত বলে মনে করেন বরং। এভাবে ব্যাংকের টাকা লুট থেকেই আর্থিক খাতের সমস্যার শুরু, আর এটিকেই আমাদের ব্যাংকিং খাতের অন্যতম প্রধান সমস্যা বলে যথার্থভাবে চিহ্নিত করেছেন তিনি।
আমাদের ব্যাংকগুলোর বিশ্ব রেকর্ড করা খেলাপি ঋণের আড়ালে একটা বিশাল অঙ্ক যে লুটপাটের কারণে ঘটেছে, এই সত্যটি প্রকাশ করে প্রকৃত অভিভাবকের পরিচয় দিয়েছেন মাননীয় গভর্নর। কারণ, ব্যাংক থেকে লুণ্ঠিত অর্থকে খেলাপি ঋণের ছদ্মাবরণে লুকিয়ে রাখার কোনো সুযোগ নেই। এই লুণ্ঠন ঘটেছে ব্যাংকিং নিয়মাচারের ব্যাপক লঙ্ঘন এবং বেনামি কিংবা অস্তিত্বহীন গ্রাহকের নামে ঋণ বিতরণের মাধ্যমে। আবার ব্যাংকের অসতর্কতা ও দুর্বল ঋণ নীতিমালার কারণে সিঁধ কাটার মতো চুরিও আছে খেলাপি ঋণের মধ্যে।
ফলে ঋণের নামে লুটপাট ও চুরি, বেনামি ঋণ এবং সর্বোপরি ইচ্ছাকৃত খেলাপি ও অনিচ্ছাকৃত খেলাপি মিলিয়ে আমাদের ব্যাংকিং খাতের ঘোষিত খেলাপি ঋণের হার এখন প্রায় ৩৩ শতাংশ, যা বিশ্বের সর্বোচ্চ হার। দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে আছে যথাক্রমে আফ্রিকার চাদ ও নিরক্ষীয় গিনি। অবশ্য বাংলাদেশের এই হার প্রকৃত অবস্থার সঠিক চিত্র কি না, সে সন্দেহ থেকেই যায়, কারণ, সব ব্যাংকই যে ঋণ শ্রেণীকরণের সবগুলো মাপকাঠি ঠিকভাবে ব্যবহার করে, এ কথা জোর দিয়ে বলা যায় না।
ঋণের নামে লুটপাটের বিষয়টি কেবল স্বীকার করেই দায়িত্ব শেষ করেননি গভর্নর, ব্যাংকিং খাতের এই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার জন্য পরবর্তী পাঁচ থেকে আট বছরে জাতীয় বাজেট থেকে প্রতিবছর ৬০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে, এমন একটা খসড়া প্রস্তাব সরকারের কাছে দিয়েছেন তিনি। সেই সঙ্গে একটা অপ্রিয় সত্য কথাও বলেছেন তিনি, যে টাকা লুট হয়েছে, সেটা জনগণের টাকা। আবার এই জনগণকেই এখন সেই টাকা দিতে হচ্ছে। লুট করে নিয়ে গেছে একজন, আর জরিমানা দিচ্ছে জনগণ। এই সত্য কথাটি উচ্চারণের জন্য তাঁকে ধন্যবাদ।
সরকারের কাছে পেশ করা খসড়া হিসাব অনুযায়ী ব্যাংকিং খাত মেরামতের জন্য বাজেট থেকে যদি আগামী পাঁচ বছর দিয়ে যেতে হয়, তাহলে মোট পরিমাণ দাঁড়াবে ৩ লাখ কোটি টাকা, আর আট বছর ধরে দিয়ে যেতে হলে মোট দাঁড়াবে ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা। এখানে আমাদের কয়েকটা তথ্য মাথায় রাখতে হবে, ২০২৫-২৬ বছরে আমাদের বার্ষিক রাজস্ব আয় ছিল ৪ লাখ কোটি টাকার মতো। সর্বশেষ ঘোষিত বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা এবং অনুমিত ঘাটতি ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা।
আমাদের আয় ও ব্যয়ের এই টানাটানির বাজেট থেকে বছরে ৬০ হাজার কোটি টাকা কীভাবে দেওয়া হবে, দিলে আমাদের ব্যয়ের কোন কোন খাতে টান পড়বে, সে আলোচনায় না গিয়ে প্রথমেই বলা যায়, এ ছাড়া ব্যাংকিং খাতকে খাদের তলা থেকে তুলে আনার কোনো বিকল্পও নেই। আমেরিকার সাবপ্রাইম সংকটের জেরে বেহালে পড়া সে দেশের আর্থিক খাত পুনরুদ্ধারে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ ৪৭ হাজার ৫০০ কোটি ডলার সহায়তা দিয়েছিল। তবে আমেরিকার তখনকার পরিস্থিতি ও পটভূমি এবং বাংলাদেশের উদ্ভূত পরিস্থিতির উৎসের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য।
আমেরিকার ব্যাংকগুলো বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল অতি লোভের কারণে, সেখানে এমন ঢালাও লুটপাট হয়নি। ২০০৭ সালের শেষার্ধে আবাসনশিল্পকে চাঙা করা এবং আসন্ন মন্দাবস্থা মোকাবিলার জন্য ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার কমাতে শুরু করলে মানুষের ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বেড়ে যায়, বিশেষ করে বাড়ি কেনার জন্য সহজ শর্তে পাওয়া ঋণ। ব্যাংকগুলো এমন অনেক গ্রাহককে বাড়ি কেনার জন্য ঋণ দিয়েছিল, যাদের ঋণ পাওয়ার কোনো যোগ্যতাই ছিল না। এই ঝুঁকিপূর্ণ ঋণই ‘সাবপ্রাইম মর্টগেজ’ নামে পরিচিতি পায়।