একজন সাংবাদিক যখন সকালে ঘর থেকে বের হন, তাঁর হাতে থাকে একটি নোটবুক, একটি কলম, কখনো একটি ক্যামেরা কিংবা মুঠোফোন। অথচ দিনের শেষে সেই কলমই কারও কাছে হয়ে উঠতে পারে হুমকি, সেই ক্যামেরাই হয়ে উঠতে পারে অপরাধের প্রমাণ, আর সাংবাদিক নিজেই হয়ে উঠতে পারেন হামলার লক্ষ্যবস্তু। গণতান্ত্রিক সমাজে এ এক ভয়াবহ বৈপরীত্য—যে মানুষটি অন্যের নিরাপত্তাহীনতা, দুর্নীতি, অনিয়ম কিংবা নিপীড়নের কথা তুলে ধরবেন, তাঁর নিজের নিরাপত্তাই যদি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তবে সমাজের আয়নাটি কোথায় দাঁড়াবে?
২ নভেম্বর পালিত হয় ‘সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অপরাধের দায়মুক্তি অবসানের আন্তর্জাতিক দিবস’। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২০১৩ সালে দিনটি ঘোষণা করে। দিনটির মূল বার্তা খুব সরল—সাংবাদিকের ওপর হামলা শুধু একজন ব্যক্তির ওপর হামলা নয়; এটি মানুষের জানার অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহির ওপর আঘাত। UNESCO-এর হিসাবে ২০০৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিশ্বে ১ হাজার ৮০০-এর বেশি সাংবাদিক নিহত হয়েছেন এবং এসব হত্যার প্রায় ৯০ শতাংশই এখনো বিচারিকভাবে অমীমাংসিত।
এই পরিসংখ্যানের ভয়াবহতা শুধু সংখ্যায় নয়, এর অন্তর্নিহিত বার্তায়। একজন সাংবাদিককে হত্যা করা হলো, তদন্ত হলো না; হামলা হলো, বিচার হলো না; হুমকি দেওয়া হলো, রাষ্ট্র নীরব থাকল—তাহলে পরবর্তী হামলাকারীর কাছে একটি বিপজ্জনক বার্তা পৌঁছে যায়: অপরাধ করেও পার পাওয়া সম্ভব। দায়মুক্তি আসলে অপরাধের দ্বিতীয় জীবন।
বাংলাদেশের বাস্তবতাও খুব স্বস্তিদায়ক নয়। ২০২৫ সালে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর হিসাবে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হুমকি, মামলা ও হয়রানির বহু ঘটনা ঘটেছে। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ওই বছর ৬৪১ সাংবাদিক বিভিন্ন ধরনের হয়রানি বা আক্রমণের শিকার হন। আইন ও সালিশ কেন্দ্রও সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও আইনি হয়রানির উল্লেখযোগ্য ঘটনা নথিভুক্ত করেছে।
২০২৬ সালেও পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলায়নি। মানবাধিকার সহায়তা সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, শুধু এপ্রিল মাসে ৪০টি ঘটনায় অন্তত ৭৫ সাংবাদিক হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হন। তাঁদের মধ্যে কেউ আহত হয়েছেন, কেউ হামলার শিকার হয়েছেন, কেউ হুমকি পেয়েছেন, আবার কেউ মামলায় জড়িয়েছেন। জুলাই মাসেও ৩৬ সাংবাদিক হামলা বা হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদনের বরাতে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এগুলো কেবল বিচ্ছিন্ন সংখ্যা নয়। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে একটি মুখ, একটি পরিবার, একটি অসমাপ্ত প্রতিবেদন এবং কখনো কখনো সত্য প্রকাশের অসমাপ্ত চেষ্টা।
গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর ঢাকায় দুটি প্রধান সংবাদমাধ্যমের কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে, সংবাদমাধ্যমের ওপর আক্রমণ কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে একটি বৃহত্তর সামাজিক সংকটে রূপ নিতে পারে। দ্য ডেইলি স্টার ও প্রথম আলোর কার্যালয়ে হামলার ঘটনায় তদন্ত শুরু হলেও ছয় মাস পরও তদন্তে অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ওই ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া ৩৭ জনের অনেকেই পরে জামিনে বেরিয়ে যান।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক সময় হামলা শারীরিক হওয়ার আগেই শুরু হয় অনলাইনে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অপপ্রচার, ব্যক্তিগত চরিত্রহনন, হুমকি, বিদ্বেষ ছড়ানো—এসবকে আমরা প্রায়ই ‘ভার্চুয়াল’ ঘটনা বলে হালকা করে দেখি। কিন্তু ডিজিটাল হুমকি যখন বাস্তব হামলার পরিবেশ তৈরি করে, তখন অনলাইন আর অফলাইনের সীমারেখা আর থাকে না। দ্য ডেইলি স্টার ও ডিসমিসল্যাবের একটি যৌথ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের সংবাদমাধ্যম কার্যালয়গুলোতে হামলার আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক প্রচারণা দীর্ঘ সময় ধরে চলেছিল। এখানেই রাষ্ট্রের দায়িত্বের প্রশ্নটি সামনে আসে।