রিওয়াইল্ডিং: প্রকৃতি পুনরুদ্ধারের সহজ পথ
সারা বিশ্বে সবকিছুতে যেন অস্থিরতা চলছে। সামাজিক, অর্থনৈতিক বা পরিবেশগত; কোনো কিছুতেই স্বস্তি নেই। মানুষের অশান্তির কারণও বেশি মানুষ ও মানুষের অতিরিক্ত ভোগস্পৃহা। জলবায়ু পরিবর্তন ও ক্রমাগত পরিবেশগত বিপর্যয় নিয়ে এখন গবেষক-বিজ্ঞানীরা চিন্তিত। বিশ্বজুড়ে বাঘ ও মেরু ভালুক থেকে শুরু করে বিরল ফুল, পাখি ও পোকামাকড় পর্যন্ত হাজার হাজার প্রজাতির জীবের আসন্ন বিলুপ্তি সম্পর্কে তাঁরা সতর্ক করেছেন। এই ধ্বংসযজ্ঞ থামানো না গেলে হয়তো এ শতকের শেষে সব উদ্ভিদ ও প্রাণিজগতের অর্ধেক বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে বলে গবেষক ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন। যদি তা হয়, তাহলে এর সঙ্গে পৃথিবীতে জীব-সহায়ক বাস্তুতন্ত্রের অনেক কিছুই হারিয়ে যাবে—যা আমাদের খাদ্য, পানি, ওষুধ সরবরাহ করছে এবং অবিরামভাবে সেসব বাস্তুতন্ত্র জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক সুরক্ষা হিসেবে কাজ করছে। তাই সারা বিশ্বে মানুষের শান্তির জন্য সুস্থ পরিবেশের কথা সব সময়ই আলোচনায় আসছে। এটি দীর্ঘদিনের এক জটিল সমস্যা, যার একটি মাত্র সহজ কোনো সমাধান নেই। সম্প্রতি ক্যারোলিন ফ্রেজার এই সংকট মোকাবিলার জন্য দূরদর্শী সমাধানের অন্তত একটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের কথা তাঁর ‘রিওয়াইল্ডিং দি ওয়ার্ল্ড’ বইয়ে তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন, রিওয়াইল্ডিং হতে পারে সেই প্রাকৃতিক সমাধান, আমাদের হারানো বা নষ্ট হওয়া প্রকৃতি পুনরুদ্ধারের সহজ পথ।
শুধু বাংলাদেশ বা এশিয়া নয়, পরিবেশগত সংকটের মুখোমুখি এখন দাঁড়িয়ে আছে ইউরোপ-আমেরিকাও।
রিওয়াইল্ডিংয়ের সহজ-সুন্দর বাংলা কী হতে পারে জানা নেই, হতে পারে পুনর্বন্যকরণ। তবে এটি শুধু বন-বনানীর বিষয় নয়। বাস্তুতন্ত্রের সব জীবপ্রজাতিকে আবার বন্যরূপে ফিরিয়ে আনাই হলো এর অর্থ। তার মানে প্রকৃতিতে কোনোরূপ হস্তক্ষেপ না করে তাকে তার মতো চলতে দেওয়া। আমরা সহজেই এটা করতে পারি। বনজঙ্গল, ঝোপঝাড়, বৃক্ষ না কেটে বনের পুনরুজ্জীবনকে সাহায্য করতে পারি, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়, সে জন্য নদীতে দেওয়া বাঁধগুলো সরিয়ে ফেলতে পারি, প্রকৃতিতে জীবপ্রজাতির সাম্যতা বজায় রাখতে নির্দিষ্ট বাস্তুতন্ত্রের অবস্থা বিবেচনা করে সেখানে জীব ছাড়তে পারি বা প্রয়োজনে সংখ্যা কমাতে পারি, পাহাড়গুলোকে ন্যাড়া না করে তার আচ্ছাদনকে প্রাকৃতিকভাবে বাড়ার সুযোগ করে দিতে পারি। বর্তমানে আমরা যা করছি তার অনেক কাজ থেকে আসলে আমাদের সরে দাঁড়ানো উচিত, প্রকৃতিকে প্রকৃতির মতো চলতে দেওয়া উচিত। মনে রাখা দরকার, প্রকৃতি শুধু মানুষের সম্পত্তি না, প্রকৃতিতে অধিকার আছে পৃথিবীর সব জীব ও অজীব উপাদানের। এসব কথা বিবেচনা করে ইউরোপ ও আমেরিকায় বর্তমানে রিওয়াইল্ডিংয়ের বেশ কিছু নীতি, প্রকল্প ও পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৯৫ সালে ইয়েলোস্টোন পার্কে একটি বন্য প্রাণী পুনঃস্থাপন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল। প্রায় ৭০ বছর ধরে সে পার্কের গাছপালা কমে যাচ্ছিল। তাতে অনেক পাখি সেখান থেকে চলে যাচ্ছিল, ভালুকরাও চলে গিয়েছিল, নদীর মাছ কমে গিয়েছিল, এমনকি শীতল জলে বাসকারী অনেক প্রাণীও কমে যাচ্ছিল, নদীর পরিবর্তন ঘটছিল, নদীর পাড় ভেঙে যাচ্ছিল। সে পার্কে হরিণের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় এসব ঘটছিল। ৭০ বছর ধরে হরিণ খাওয়ার মতো সেখানে কোনো নেকড়ে ছিল না। তাই সে পার্কে প্রকল্পের মাধ্যমে নেকড়ে ছাড়া হয়েছিল আর তার ফল হয়েছিল অত্যাশ্চর্য! নেকড়েরা আসায় হরিণদের আচরণে পরিবর্তন আসে। নেকড়েরা প্রায়ই নদীর পাড়ে থাকত, তাই নেকড়ের ভয়ে হরিণ নদীর পাড়ে আসা ছেড়ে দিল, এতে নদীর পাড় ভাঙা বন্ধ হলো। সেখানে গাছের চারা গজালে সেসব ছোট ছোট চারাও হরিণের দল খেয়ে ফেলত। নেকড়ের শিকারে হরিণের সংখ্যা কমে যায়। ফলে কিছু কিছু গাছ মাত্র ছয় বছরে প্রায় পাঁচগুণ লম্বা হয়ে যায়। বনের স্বাস্থ্য ফিরে আসায় সেখানে পাখি ও অন্যান্য বন্য প্রাণীও ফিরে আসে। যেসব ভালুক চলে গিয়েছিল সেগুলোও ফিরে আসে। এই একটি ঘটনাই পুনর্বন্যকরণের সুফল বোঝানোর জন্য মনে হয় যথেষ্ট। সুন্দরবন যদি কখনো বাঘশূন্য হয়ে যায়, তবে নিশ্চিত যে সেটি হরিণদের দখলে চলে যাবে, বনে হয়তো আর গাছ থাকবে না। তাই এটি কোনো ভবিষ্যতের ধারণা নয়। এটি এখন ঘটছে, বাস্তব জায়গায়, এবং এর বাস্তব ফলও পাওয়া যাচ্ছে।
মানুষের জন্য প্রকৃতি পুনরুদ্ধার কেন গুরুত্বপূর্ণ? সুস্থ বাস্তুতন্ত্র শুধু উদ্ভিদ ও প্রাণীদেরই উপকার করে না, এটি সব পার্থিব সৃষ্টিকে অলক্ষ্যে একটি চমৎকার শিকলে বেঁধে রেখেছে। বিশুদ্ধ জল, উর্বর মাটি, স্থিতিশীল আবহাওয়া—এই সবই কার্যকর প্রাকৃতিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। প্রকৃতি পুনরুদ্ধার সেই ব্যবস্থাগুলোকে পুনর্গঠন করতে সাহায্য করে। যখন বন ফিরে আসে, তখন তা বাতাসকে শীতল করে, মাটিতে জল ধরে রাখে। যখন নদী অবাধে প্রবাহিত হয়, তখন তা বন্যার ঝুঁকি কমায় ও মাছ চাষে সহায়তা করে। যখন জীববৈচিত্র্য বৃদ্ধি পায়, তখন বাস্তুতন্ত্র আরও স্থিতিশীল হয়, বিভিন্ন চাপ সামলাতে প্রকৃতি তখন আরও সক্ষম হয়ে ওঠে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- প্রকৃতি
- পুনরুদ্ধার