প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ তুলেছেন। তার দাবি, কার্যক্রম নিষিদ্ধ অবস্থায় থাকা আওয়ামী লীগ এবং বর্তমানে বিরোধী দলের নেতৃত্বে থাকা জামায়াতে ইসলামী গোপনে সমঝোতায় পৌঁছেছে। তবে এটা আদর্শের ভিত্তিতে নয়, বরং একটি অভিন্ন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই দল দুটি কাছাকাছি এসেছে বলে অভিযোগ তার। কয়েক দিন আগে এক জনসভায় তিনি বলেন, গোয়েন্দা প্রতিবেদনে দল দুটির মধ্যে একটি নতুন যোগসাজশের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
এই অভিযোগের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। কেননা এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইতিহাসের এক পরিহাস। কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্নে আওয়ামী লীগ ও জামায়াত পরস্পরবিরোধী অবস্থান দেখিয়ে আসছে। তাদের বিভেদের সবচেয়ে গভীর বিষয়—একাত্তরের স্মৃতি, যে বছর বাংলাদেশের জন্ম। তবে তারেক রহমানের দাবি, প্রকাশ্য বৈরিতার আড়ালে দল দুটির মধ্যে সমঝোতা রয়েছে। এই অভিযোগ রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন, নাকি নিছক রাজনৈতিক বক্তব্য—তা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ রয়েছে। উল্লেখ্য, তার বক্তব্যের সংবাদ প্রকাশের সময়ও জানানো হয়েছে, দাবিগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এমন গোপন সমঝোতার অস্তিত্ব প্রমাণে এখন পর্যন্ত কোনো অকাট্য তথ্যও প্রকাশ্যে আসেনি।
উইলিয়াম শেকসপিয়রের ‘দ্য টেম্পেস্ট’ নাটকের বিখ্যাত উক্তি, ‘দুর্দশা মানুষকে বিচিত্র সঙ্গীর সঙ্গে পরিচিত করে।’ আধুনিক রাজনৈতিক আলোচনায় এই ভাবনাটিই রূপ নিয়েছে বহুল প্রচলিত প্রবাদে—‘রাজনীতি বিচিত্র সঙ্গী তৈরি করে’। রাজনৈতিক প্রয়োজন কীভাবে আদর্শিক সীমারেখা অতিক্রম করে, এই কথাটি তার ইঙ্গিত দেয়। আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর সম্পর্ক এ প্রবণতার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
রাজনৈতিক দর্শন ও বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতে গভীর পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও ষাটের দশকে ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের স্বৈরশাসনের বিরোধিতায় দল দুটি অভিন্ন অবস্থানে এসেছিল। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার বৃহত্তর লক্ষ্য সামনে রেখে ১৯৬৪ সালে তারা অন্য বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে মিলে সম্মিলিত বিরোধী দল বা কম্বাইন্ড অপজিশন পার্টির (সিওপি) ব্যানারে ঐক্যবদ্ধ হয়। ১৯৬৯ সালেও আইয়ুব খানের শাসনের বিরুদ্ধে এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ ও জামায়াত আরও কয়েকটি দলের সঙ্গে মিলে ডেমোক্র্যাটিক অ্যাকশন কমিটি (ডিএসি) গঠন করে।
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন পাকিস্তানের রাজনৈতিক দৃশ্যপট আমূল বদলে দেয়। আওয়ামী লীগ বিপুল জনসমর্থন নিয়ে বিজয়ী হয়, অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী একটি আসনও পায়নি। তবে নির্বাচনে পরাজয় দুই দলের সম্পর্কের ইতি টানেনি। জামায়াত নেতারা প্রকাশ্যে শেখ মুজিবুর রহমানকে ঐতিহাসিক বিজয়ের জন্য অভিনন্দন জানান ও সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করেন। ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ ঢাকায় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসার কথা থাকলেও তা স্থগিত করা হলে জাতীয় সংকট আরও ঘনীভূত হয়। এ সময় জামায়াতে ইসলামীর নেতা গোলাম আযম শেখ মুজিবের সঙ্গে দেখা করেন এবং কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে তার অসহযোগ কর্মসূচির প্রতি সমর্থন জানান। তখন ক্রমবর্ধমান সাংবিধানিক সংকটের বিপরীতে অল্প সময়ের জন্য হলেও দুই দলকে একই পক্ষে অবস্থান করতে দেখা যায়।
কিন্তু এই ভঙ্গুর ঐক্য পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের ধাক্কা সামলে টিকে থাকতে পারেনি। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সামরিক অভিযান রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে দেয়। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করায় আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের পথ চিরতরে আলাদা হয়ে যায়।
স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়। ১৯৭২ সালের সংবিধানে জামায়াতসহ ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়। দলটির অনেক নেতা নির্বাসনে চলে যান, অন্যরা রাজনৈতিকভাবে প্রান্তিক অবস্থায় পড়ে থাকেন। ১৯৭৫ সালের আগস্টে শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার ঘটনা দেশের রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করে। পরবর্তী বছরগুলোতে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলের ওপর বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া হয়। ফলে জামায়াত আবার রাজনীতিতে ফিরে আসার সুযোগ পায়।
আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের মধ্যে গভীর অবিশ্বাস এবং আদর্শিক বিরোধ অব্যাহত থাকলেও পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি ধীরে ধীরে তাদের এক অসম্ভব, যদিও সাময়িক, অংশীদারত্বের দিকে ঠেলে দেয়।
আওয়ামী লীগ-জামায়াত সম্পর্কের ইতিহাসে অন্যতম উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হলো আশির দশকের এরশাদবিরোধী আন্দোলন। ১৯৮৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই রাজনৈতিক নৈকট্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পৃথক প্রতীকে নির্বাচন করলেও দুই দলই সংসদে প্রবেশ করে। জামায়াত পায় ১০টি আসন। এর মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার পর থেকে দলটি যে রাজনৈতিক বৈধতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত ছিল, তার একটি মাত্রা অর্জন করে। পরে এরশাদবিরোধী আন্দোলন জোরালো হলে দুই দলকেই একই পক্ষে দেখা যায়।
নব্বইয়ের দশকে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের জটিল ও পরস্পরবিরোধী সম্পর্কের আরেকটি অধ্যায় তৈরি হয়। ওই দশকের রাজনৈতিক লড়াইয়ের কেন্দ্রে ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রশ্ন—জাতীয় নির্বাচন পরিচালনার জন্য নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা। এই লক্ষ্য অর্জনে জামায়াত-আওয়ামী লীগ অন্য বিরোধী দলগুলোর সঙ্গে মিলে খালেদা জিয়ার বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আন্দোলনে অংশ নেয়। আন্দোলনের চাপে শেষ পর্যন্ত তৎকালীন সরকার সংবিধান সংশোধনের পথে হাঁটে, আর তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি হয়।