এইচএসসির ফলাফল ২০২৬ : জিপিএ-৫ ও কয়েকটি প্রশ্ন
৩১ অক্টোবর ২০২৬ উচ্চ মাধ্যমিক ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে। ফল কেমন হয়েছে তা ইতিমধ্যে সবাই জেনে গেছেন। স্বনামধন্য একটি পত্রিকার সংবাদ উদ্ধৃত করা যাক, এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন। পাসের হার ৫২.১২ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৪০ হাজার ৮৪ জন।
এবার একটু গত কয়েক বছরের পাশের হারে চোখ বোলানো যাক। ২০২১ সালে পাসের হার ছিল ৯৫.৫৭, জিপিএ-ফাইভ ১ লাখ ৮৯ হাজার। ২০২২ সালে পাস ৮৪.৩১ শতাংশ, জিপিএ-ফাইভ ১ লাখ ৭৬ হাজার। ২০২৩ সালে পাসের হার ৭৮.৬৪, আর জিপিএ-ফাইভ ৯২ হাজার। ২০২৪ সালে পাস ৭৭.৭৮ শতাংশ আর জিপিএ-ফাইভ ১ লাখ ৪৫ হাজার। ২০২৫ সালে পাস ৫৮.৮৩ শতাংশ ও জিপিএ-ফাইভ ৬৯ হাজার।
প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন।
শিরোনাম দেখে অনেকেই নড়েচড়ে বসেছেন। দেশের শিক্ষাব্যবস্থা কোন দিকে যাচ্ছে, পাসের হারে এই ক্রমপতনের কারণ কী তা নিয়ে মাঠ গরম করে বক্তৃতাও হয়তো দিয়ে দিচ্ছেন। অনেকেই মনে করিয়ে দিচ্ছেন, বাইশ বছরে এটিই উচ্চ মাধ্যমিকে পাশের সর্বনিম্ন হার।
এ থেকে আমরা কী বুঝব? শিক্ষার্থীদের মেধা ও যোগ্যতায় অধোগতি, নাকি পরীক্ষা দিলেই পাস-এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসার সূচনা? আমি বিষয়টি একটু ভিন্ন প্রেক্ষিত থেকে দেখতে চাই। এ প্রশ্নটি সামনে নিয়ে আসতে চাই, যে পদ্ধতিতে আমরা শিক্ষার্থীদের যোগ্যতা-অযোগ্যতা বিচার করছি সেটি নিয়ে গভীরভাবে ভাবনার প্রয়োজন আছে কিনা।
গুরুতর এ প্রশ্নটি তুলতে চাই যে, প্রথাগত এ পদ্ধতিতে ‘গোল্ডেন জিপিএ’ নিয়ে পাস করা শিক্ষার্থী কেন উচ্চতর পর্যায়ে গিয়ে ন্যূনতম সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী সক্ষমতার পরিচয় দিতে পারছে না? গলদটা কোথায়?
আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াই গেল প্রায় দুই যুগ ধরে। ইদানীংকালের অনেক শিক্ষার্থীর বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের পারফরম্যান্স দেখে, সোজা বাংলাতেই বলি, আমি কেবল হতাশই নই, শঙ্কিতও। এবারের এইচএসসি পরীক্ষার ফলেও দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে ইংরেজি ও আইসিটিতে।
ইংরেজি শিখলেই জীবন সফলতায় উদ্ভাসিত আর না শিখলে ব্যর্থ–এমন অযৌক্তিক ধারণায় আমি বিশ্বাসী নই। কিন্তু জীবন-জীবিকা, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ আর মোটা দাগে অধিকাংশ পেশায় সফলতা পেতে গেলে ইংরেজি যে একটি বড় ধরনের সহায়ক ভূমিকা রাখে সেটিই বা অস্বীকার করি কী করে?
আমার বাবা ষাটের দশকের শুরুতে স্নাতক পাস করেছিলেন। পিতামহ করেছিলেন ত্রিশের দশকের শুরুতে। তাদের কথা বাদ দিই, এর অনেক পরেও মাধ্যমিক-উচ্চ মাধ্যমিক বা স্নাতক পাস করা শিক্ষার্থীরাও কেবল ইংরেজিতেই নয়, বাংলা, গণিত, বিজ্ঞানসহ সব বিষয়ে স্বাভাবিক দক্ষতা প্রদর্শন করেছেন।
কয়েক দশকের মধ্যে এমন কী হয়ে গেল যে সেই স্বাভাবিক দক্ষতা প্রদর্শনও শিক্ষার্থীদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না? অথচ এর মধ্যে একের পর এক পরীক্ষামূলক, উদ্ভাবনী পদ্ধতি হাতে নেওয়া হয়েছে। এ বছর এক নিয়ম তো পরবর্তী বছরেই আরেক। অথচ ফল তথৈবচ। এর কারণ সম্বন্ধে গভীরভাবে ভাবার সময় এসেছে।
এত এত বই, চটকদার কারিকুলাম, অত্যাধুনিক পশ্চিমা শিক্ষাপদ্ধতি–সবকিছুর পরও বিভিন্ন বিষয়ে কাঙ্ক্ষিত দক্ষতার ধারে কাছেও যেতে পারছে না সিংহভাগ শিক্ষার্থী। কেন? বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্যই এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজা দরকার।