আবুল হাসনাত স্মরণে কয়েকটি কথা
কবি-অধ্যাপক-প্রাবন্ধিক নরেশ গুহকে লেখা এক চিঠিতে বুদ্ধদেব বসু বলেছিলেন, ‘সাংবাদিকতা সাহিত্যের শত্রু। সাবধান!’ এই চিঠি যখন লিখছেন বুদ্ধদেব, তখন স্টেটসম্যান পত্রিকায় নিয়মিত সম্পাদকীয় লেখার কাজটি তিনি ছেড়ে দেবার কথা গভীরভাবেই চিন্তা করছেন এবং ছেড়েও দিয়েছিলেন কিছুদিনের মধ্যে। সাহিত্যের প্রতি তীব্র এক ভালোবাসা থেকেই তাঁকে এমন একটি সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল। অবশ্য এটিও ঠিক যে আমাদের মতো দেশগুলোতে বারবার পেশা বদলের সক্ষমতা সব লেখকের থাকে না। নানা কারণেই এখানে সে সুযোগ খুবই সীমিত। সেই সীমিত পরিসরের কথা যখন ভাবি, তখনই আবুল হাসনাতের কথা মনে না করে পারা যায় না। সেই কথাগুলোই এখানে বলার চেষ্টা করা হবে।
একজন সম্পাদক হিসেবে আবুল হাসনাতের কৃতিত্বের কথা নতুন করে কিছু না বললেও হয়তো চলবে। তিনি ঐতিহ্যবাহী দৈনিক ‘সংবাদে’র সাহিত্য সাময়িকীর পাতার সম্পাদনার দায়িত্ব একটানা দীর্ঘ ২৪ বছর ধরে পালন করেছিলেন। এর পরে যুক্ত হন সাহিত্য পত্রিকা ‘কালি ও কলম’-এর সম্পাদনায়; একই সঙ্গে চিত্রকলাবিষয়ক ত্রৈমাসিক ‘শিল্প ও শিল্পী’র সম্পাদকের দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছিলেন। তারও আগে তিনি সম্পাদনা করেছিলেন ‘গণসাহিত্য’-এর মতো মাসিক সাহিত্য পত্রিকা। খ্যাতনামা কবি-প্রাবন্ধিক প্রয়াত আবদুল মান্নান সৈয়দ ১৯৯৪ সালে তাঁর এক গ্রন্থের ভূমিকায় আবুল হাসনাতের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে লিখেছিলেন, ‘আমার সমালোচনামূলক ও সমালোচনাব্যতিরেকে অনেক লেখা তাঁরই তাগিদে রচিত—আনন্দ ও গর্বের সঙ্গে একথা আজ আমি বলতে চাই। কবি ও লেখক হিসেবে তাঁর একটি পরিচিতি আছে; কিন্তু আমি মনে করি, সম্পাদক হিসেবেই তিনি শ্রেষ্ঠ; আমি মনে করি, সম্পাদক হিসেবে তিনি সিকান্দার আবু জাফর, হাসান হাফিজুর রহমান, আবদুল গনি হাজারী, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ প্রমুখের গৌরবোজ্জ্বল উত্তরাধিকার বহন করছেন। ব্যক্তিগতভাবে তাঁর কাছে আমার ঋণ অনিঃশেষ—কেননা তাঁর ধৈর্যশীল ও নিরন্ত চাপে ও তাগিদে অলস ও অস্থির আমাকে অনেক লেখা লিখতে হয়েছে।’
সম্পাদনার পাশাপাশি তিনি ‘মাহমুদ আল জামান’ নামে গল্প-কবিতা-উপন্যাস-প্রবন্ধ নিয়মিত লিখেছেন। তাঁর সম্পর্কে বলা হয়ছে যে ‘ষাটের দশক থেকে কাব্যচর্চার সূত্রপাত। ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ ষাটের দশকের প্রতিবাদ ও সংগ্রামমুখর জীবনের প্রতিচ্ছবি যেমন তাঁর কাব্যবিশ্বাসে জায়গা নিয়েছে, তেমনি স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তিজনিত আনন্দ-বেদনা, অস্থিরতা, নৈরাশ্য ও সংকটময় মুহূর্তগুলোও তাঁর বোধে প্রবলভাবে নাড়া দিয়েছে। সব কিছুর অন্তরালে রোমান্টিক কাব্যধারারও প্রবল স্রোত তাঁর চেতনায় নীরবে বয়ে গেছে।’ আমরা বলতে পারি যে, জ্যোৎস্না ও দুর্বিপাক, কোনো একদিন ভুবনডাঙায় কিংবা ভুবনডাঙার মেঘ ও নধর কালো বেড়াল কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলোর আমেজ সময়ের নির্ভরতা অতিক্রম করে পাঠকের মনে অনুরণিত হবে আরও দীর্ঘদিন।
২০১৭ সালে তাঁর এক নিবিড় ‘আত্মকথনে’ আবুল হাসনাত বলেছিলেন, ‘কবিতা লিখছি ষাটের দশক থেকে। কেন লিখি এ কখনও ভেবে দেখিনি। হৃদয়, মন, মস্তিষ্ক কখনো-সখনো দিন যাপনের দুঃখ, বেদনা, কষ্ট, গ্লানি, আনন্দ কবিতা লিখতে প্রেরণা দেয়। কখনও অঙ্গীকারের তাগিদে, কখনও ভাবাবেগে তাড়িত হয়ে। কখনও সুদূর অতীতে দেখা কোনো এক হেমন্ত শীত সকালের কথা ভেবে। স্মৃতি কখনও মিছিলে উত্তোলিত কোনো নারীর রণক্লান্ত হাত বড়ই উদ্বেল করে।’
তাঁর সতীনাথ, মানিক, রবিশঙ্কর ও অন্যান্য; জয়নুল, কামরুল, সফিউদ্দীন ও অন্যান্য প্রবন্ধগ্রন্থ আমাদের সাহিত্যের উর্বর সঞ্চয়। শিশু ও কিশোরদের জন্য তিনি রচনা করেছিলেন ইস্টিমার সিটি দিয়ে যায়, টুকু ও সমুদ্রের গল্প, যুদ্ধদিনের ধূসর দুপুরে, রানুর দুঃখ-ভালোবাসা; এ ছাড়া লিখেছেন জসীমউদ্দীন, সূর্য সেনের কিশোর-জীবনী। কিন্তু শুরুতেই যে কথাটি বলা হয়েছে, সেটি আবুল হাসনাতের বেলায়ও ঘটেছে। পত্রপত্রিকায় সম্পাদনার চাকরি তাঁর সাহিত্যনিষ্ঠাকে নানাভাবেই গ্রাস করে ফেলেছিল। আবুল হাসনাত নিজেও এ বিষয়ে সচেতন ছিলেন, অন্তত তাঁর স্মৃতিকথায় সেসবের সাক্ষ্য রয়েছে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- স্মরণ
- আবুল হাসনাত