টিভিতে সংবাদটি দেখে মনটা বেশ খারাপ হয়ে গেল। ফেনীর মাছের বাজারে বিছিয়ে রাখা হয়েছে শত শত মণ পচা ইলিশ। ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে রাত ১২টায় জেলেরা নদীতে গেছেন মাছ ধরতে। এরই মধ্যে পরদিন সকালের আলো না ফুটতেই এত মাছ! আবার সেসব মাছের পচা গন্ধে গোটা বাজার সয়লাব হয়ে গেছে! এর রহস্য কী?
ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা কয়েক ঘণ্টা আগে শেষ হয়েছে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পরদিনই ফেনীর বাজার ও মাছঘাটে শত শত মণ পচা ইলিশের দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ার অভিযোগ উঠলে কৌতূহল জাগে, এত মাছ এল কোথা থেকে? নিষেধাজ্ঞার সময় ধরা হয়ে থাকলে সেগুলো কোথায়, কার হেফাজতে এবং কীভাবে এত দিন লুকিয়ে রাখা হয়েছিল? আর যদি বৈধ সময়ে ধরা মাছই অব্যবস্থাপনায় পচে গিয়ে থাকে, তাহলে দায় নেবে কে? মা ইলিশের প্রজনন রক্ষায় সাধারণ জেলেদের নদী-সাগর থেকে দূরে থাকতে বলা হয়; অথচ নিষেধাজ্ঞা শেষে বিপুল পরিমাণ পচা মাছের সন্ধান মিললে রাষ্ট্রীয় তদারকির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
বাংলাদেশে মা ইলিশ সংরক্ষণে প্রতিবছর নির্দিষ্ট সময়ে মাছ ধরা, পরিবহন, মজুত, বাজারজাতকরণ ও কেনাবেচার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। ২০২৬ সালে ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর ছিল। এ সময় মৎস্য বিভাগ, জেলা প্রশাসন, নৌপুলিশ ও কোস্টগার্ডের অভিযান পরিচালনার কথা।
ফেনীর ঘটনায় পচা ইলিশের পরিমাণ, উৎস ও সংরক্ষণস্থল সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য ছাড়া কাউকে দায়ী করা যাবে না। তবে অভিযোগটি সত্য হলে এর পেছনে অবৈধ মাছ আহরণ, গোপন মজুত, অপর্যাপ্ত হিমায়ন কিংবা তদারকির দুর্বলতা—যেকোনোটি কাজ করে থাকতে পারে। তাই প্রয়োজন অনুমাননির্ভর দোষারোপ নয়, তথ্যভিত্তিক তদন্ত।
আমাদের কৌতূহল হলো, এত শত মণ মাছ কোথায় লুকিয়ে রাখা হয়েছিল? এত বিপুল মাছ সংরক্ষণ করতে প্রয়োজন বড় আড়ত, গুদাম, বরফকল, বাণিজ্যিক ফ্রিজার কিংবা হিমাগার। মাছগুলো নিষেধাজ্ঞার সময় ধরা হয়ে থাকলে শুধু জেলেদের জিজ্ঞাসাবাদ যথেষ্ট নয়। অনুসন্ধান করতে হবে নৌকার মালিক, মাছ ধরার অর্থদাতা, ক্রেতা, আড়তদার ও পরিবহনকারীদেরও। মাছের চালান, ক্রয়-বিক্রয়ের হিসাব এবং সংরক্ষণাগারের নথি পরীক্ষা করলে অবৈধ সরবরাহশৃঙ্খলের সন্ধান মিলতে পারে।
তবে নিষেধাজ্ঞার পর মাছ পাওয়া গেলেই তা অবৈধভাবে ধরা হয়েছিল, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। মাছ আহরণের তারিখ ও উৎস যাচাই করতে হবে। বৈধ সময়ে ধরা মাছও দীর্ঘদিন যথাযথভাবে সংরক্ষণ না করলে পচে যেতে পারে।
এই দামি ইলিশগুলো পচল কেন, এসব বাজারে এল কীভাবে? ইলিশ অত্যন্ত পচনশীল মাছ। আহরণের পরপরই পর্যাপ্ত বরফ দেওয়া, উপযুক্ত তাপমাত্রায় রাখা এবং স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করা জরুরি। সংরক্ষণে অবহেলা, বিদ্যুৎ বিভ্রাট কিংবা হিমায়নযন্ত্রের ত্রুটিতে মাছ নষ্ট হতে পারে। আবার নিষেধাজ্ঞার সময় অবৈধভাবে ধরা মাছ গোপনে রাখতে গিয়ে সংরক্ষণব্যবস্থায় অবহেলা করা হলেও একই পরিণতি ঘটতে পারে।