চীন ও পাকিস্তানের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। এ সম্পর্কের ভিত্তি শুধু কূটনৈতিক বন্ধুত্ব বা অর্থনৈতিক সহযোগিতা নয়। এর কেন্দ্রে রয়েছে প্রতিরক্ষা, সামরিক প্রযুক্তি, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে অভিন্ন স্বার্থ। ‘কারাকোরাম ২০২৬’ নামের সামরিক সহযোগিতা এ সম্পর্ককে আরও নিবিড় করেছে। ভারত-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ভারত-পাকিস্তান বৈরিতা, কাশ্মীর প্রশ্ন এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার মধ্যে এ সহযোগিতার তাৎপর্য দক্ষিণ এশিয়ার প্রচলিত নিরাপত্তা সমীকরণে বিশেষ গুরুত্ব রাখে।
কারাকোরাম ২০২৬-এর তাৎপর্য বুঝতে হলে প্রথমেই এর সামরিক বৈশিষ্ট্যটি লক্ষ করা দরকার। চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ১০ অক্টোবরের ঘোষণায় চীনের জিনজিয়াং অঞ্চলের কোরলা শহরে অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে চীনা পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনী যৌথ প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়ার তথ্য জানানো হয়। এ প্রশিক্ষণের বিষয় ছিল উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে যৌথ সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান। এতে ড্রোন পরিচালনা, চলন্ত অবস্থায় লক্ষ্য শনাক্ত ও আঘাত, দূরপাল্লার স্নাইপিং, যৌথ কমান্ড এবং সরাসরি সেনা-অংশগ্রহণমূলক মহড়া অন্তর্ভুক্ত ছিল। চীনা প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় একে দুই দেশের সেনাবাহিনীর প্রথম যৌথ প্রশিক্ষণ হিসাবে বর্ণনা করেছে। ২২ অক্টোবর নয় দিনের এ মহড়া শেষ হয়।
এই প্রথম যৌথ সেনা প্রশিক্ষণ ছাড়াও চীন-পাকিস্তান বহু বছর ধরে সামরিক সহযোগিতা করে আসছে। দুই দেশের বিমানবাহিনীর ‘শাহিন’ এবং নৌবাহিনীর ‘সি গার্ডিয়ান’ মহড়া সেই সহযোগিতার পরিচিত উদাহরণ। সন্ত্রাসবিরোধী প্রশিক্ষণের জন্য ‘ওয়ারিয়র’ সিরিজও চালু রয়েছে। কিন্তু কারাকোরাম ২০২৬-এ নিয়মিত স্থলবাহিনীর অংশগ্রহণ এবং যৌথ কমান্ড ও সমন্বিত অভিযানের অনুশীলন সামরিক সম্পর্ককে ভিন্ন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়। এতদিন অস্ত্র সরবরাহ, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং বিশেষায়িত ইউনিটের প্রশিক্ষণ ছিল সহযোগিতার প্রধান ক্ষেত্র। এখন দুই দেশের সেনাবাহিনী কীভাবে একই অভিযানে কাজ করতে পারে, সেই সক্ষমতা যাচাইয়ের বিষয়টিও সামনে এসেছে।
চীন-পাকিস্তান সামরিক সম্পর্কের একটি বড় ভিত্তি হলো পাকিস্তানের অস্ত্র আমদানিতে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রাধান্য। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্যে বলা হয়েছে, ২০২১-২০২৫ সময়ে চীনের মোট অস্ত্র রপ্তানির ৬১ শতাংশ পেয়েছে পাকিস্তান। এ পরিসংখ্যান দুই দেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্কের গভীরতা বোঝায়। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর অস্ত্র, বিমান, নৌযান, ড্রোন এবং অন্যান্য প্রযুক্তিতে চীনা সরঞ্জামের উপস্থিতি বেড়েছে। ফলে দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে প্রযুক্তিগত পরিচিতি ও পারস্পরিক নির্ভরশীলতা তৈরি হয়েছে।
কারাকোরাম ২০২৬-এ ব্যবহৃত অস্ত্র ও সরঞ্জামও এ সম্পর্কের একটি দিক প্রকাশ করে। চীনা সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রশিক্ষণে টাইপ ১৯১ রাইফেল, টাইপ ২০১ স্কোয়াড মেশিনগান, টাইপ ১১ সাঁজোয়া যান, টাইপ ০৮ পদাতিক যুদ্ধযান, আর্টিলারি, ড্রোন এবং ড্রোন প্রতিরোধী ব্যবস্থা ব্যবহৃত হয়েছে। এসব সরঞ্জাম চীনের সরবরাহ করা হয়েছিল বলে চীনা সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অস্ত্রের সংখ্যা বা ধরন নয়। বরং একই অস্ত্রব্যবস্থা ব্যবহার করে দুই দেশের সেনারা কতটা সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারে। আধুনিক যুদ্ধে একটি বাহিনীর শক্তি শুধু উন্নত অস্ত্রের ওপর নির্ভর করে না। সেনাদের প্রশিক্ষণ, যোগাযোগব্যবস্থা, গোয়েন্দা তথ্যের আদান-প্রদান, লক্ষ্য শনাক্তকরণ, কমান্ড কাঠামো এবং বিভিন্ন ইউনিটের পারস্পরিক সহযোগিতা সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটি বাহিনী অন্য দেশের অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে, কিন্তু যৌথ অভিযানে কার্যকর হতে হলে তার কৌশলগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সামঞ্জস্যও প্রয়োজন।