এইচএসসির ফল: ব্যর্থতার দায় কার, শিক্ষার্থীর নাকি শিক্ষাব্যবস্থার?
এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সামনে আবারও এক কঠিন প্রশ্ন এসে দাঁড়িয়েছে—আমরা কি সত্যিই শিক্ষার্থীদের শেখাতে পারছি, নাকি কেবল পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করছি? এ বছর ১১টি শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। অর্থাৎ পরীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থীই উত্তীর্ণ হতে পারেনি। সংখ্যাটি শুধু একটি পরীক্ষার ফল নয়; এটি শ্রেণিকক্ষ, পাঠদান, মূল্যায়ন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি এবং আমাদের সামগ্রিক শিক্ষাদর্শের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যালোচনার দাবি জানায়।
জাগো নিউজের প্রকাশিত ফলের সারসংক্ষেপ অনুযায়ী, এ বছর পাসের হার গত বছরের ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ থেকে কমে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশে নেমেছে। জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও ৬৯ হাজার ৯৭ থেকে কমে ৪০ হাজার ৮৪ হয়েছে। তবে এই ফলের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, ২৯৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে একজন শিক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি। বিপরীতে শতভাগ পাস করেছে মাত্র ১৩৯টি প্রতিষ্ঠান। এই দুই বিপরীত চিত্রের মাঝখানেই লুকিয়ে
এবার ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন পরীক্ষার্থী নিবন্ধন করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে পরীক্ষায় অংশ নেন ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন। উত্তীর্ণ হয়েছেন ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন। অর্থাৎ অকৃতকার্য হয়েছেন ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জন। নিবন্ধিত ও পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা এক নয়—ফলের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে এই পার্থক্যটি মনে রাখা জরুরি।
পাসের হার কমেছে, কিন্তু শুধু এই একটি সংখ্যা দিয়ে শিক্ষাব্যবস্থার মান বিচার করা যাবে না। প্রশ্ন হলো, এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী কেন উত্তীর্ণ হতে পারলেন না? তাঁরা কি পড়াশোনা করেননি, নাকি তাঁদের শেখানোর ক্ষেত্রে ঘাটতি ছিল? প্রশ্নপত্র কি আগের তুলনায় কঠিন হয়েছে, নাকি মূল্যায়ন এবার বেশি কঠোর হয়েছে? শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদানের মান এবং পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন—সবকিছুই পর্যালোচনার দাবি রাখে। ফল খারাপ হলেই শিক্ষার্থীদের অযোগ্য বলে দাগিয়ে দেওয়া সহজ; কিন্তু সেই ব্যর্থতার পেছনে শিক্ষাব্যবস্থার দায় কতটা, সেটি খুঁজে দেখা অনেক বেশি জরুরি।
এবারের ফলের একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো ইংরেজি ও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়া। প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইংরেজিতে ফেল করেছেন ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫২৮ জন এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৪৯৩ জন। দুই বিষয়ে বিষয়ভিত্তিক অকৃতকার্যের সংখ্যা যোগ করলে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৮২ হাজার ২১। একই শিক্ষার্থী দুই বিষয়েই ফেল করে থাকতে পারেন, তাই সংখ্যাটিকে আলাদা শিক্ষার্থীর সংখ্যা হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। তবে এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে, বিষয় দুটিতে বড় ধরনের শিখনঘাটতি রয়েছে।
ইংরেজিতে এত শিক্ষার্থীর ব্যর্থতা আমাদের দীর্ঘদিনের একটি সমস্যার দিকে আঙুল তোলে। স্কুলজীবন থেকে ইংরেজি পড়ানো হলেও বহু শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়েও একটি অনুচ্ছেদ বুঝে পড়তে, নিজের বক্তব্য লিখতে কিংবা ব্যাকরণের মৌলিক প্রয়োগ করতে হিমশিম খান। অনেক ক্ষেত্রে ইংরেজি শেখা মানে হয়ে দাঁড়ায় পরীক্ষার জন্য কিছু নিয়ম মুখস্থ করা, প্রশ্নের ধরন চিনে উত্তর লেখা। ভাষা শেখার যে চারটি মৌলিক দক্ষতা—শোনা, বলা, পড়া ও লেখা—তার মধ্যে প্রথম দুটি প্রায়ই শ্রেণিকক্ষের চর্চায় উপেক্ষিত থাকে। ফলে পরীক্ষায় পাঠ্যবইয়ের বাইরে সামান্য পরিবর্তিত প্রশ্ন এলেই শিক্ষার্থীরা বিপাকে পড়েন।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রশ্ন আছে। পাঠ্যসূচিতে প্রযুক্তি থাকলেই শিক্ষার্থী প্রযুক্তিতে দক্ষ হয়ে ওঠেন না। কম্পিউটার, ইন্টারনেট, সফটওয়্যার কিংবা তথ্যপ্রযুক্তির মৌলিক ধারণা হাতে-কলমে শেখানোর সুযোগ না থাকলে বিষয়টি মুখস্থনির্ভর হয়ে পড়ে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট কিংবা প্রশিক্ষিত শিক্ষক নেই। কোথাও আবার ব্যবহারিক ক্লাসের নামে কেবল উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়। বাস্তব অভিজ্ঞতা ছাড়া প্রযুক্তি শিক্ষার মূল্যায়ন কতটা কার্যকর হতে পারে?