স্বপ্নের ইউরোপে জীবনযাত্রার সংকট ও তরুণদের আন্দোলন
ফ্রান্সের বিশ্ববিদ্যালয় চত্বর থেকে শুরু করে স্পেনের রাজপথ, ইতালির চত্বর থেকে পর্তুগালের লিসবনের ঐতিহাসিক গলি—আজ ইউরোপের একের পর এক দেশ উত্তাল। সংবাদমাধ্যমের পর্দায় আমরা নিয়মিত দেখছি জলকামান, কাঁদানে গ্যাস আর প্ল্যাকার্ড হাতে হাজার হাজার তরুণের মিছিল। আপাতদৃষ্টিতে এই বিক্ষোভগুলোকে ভিন্ন ভিন্ন দেশের বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা স্থানীয় কোনো দাবির আন্দোলন মনে হতে পারে।
ফ্রান্সে শিক্ষার্থীরা ক্লাসরুমে শিক্ষকসংকটের প্রতিবাদ করছে, স্পেনে তরুণরা লড়ছে আকাশচুম্বী বাড়িভাড়ার বিরুদ্ধে, আবার পর্তুগালে আন্দোলন হচ্ছে জীবনযাত্রার ব্যয়ের সাথে বেতনের অসঙ্গতি নিয়ে। কিন্তু একটু গভীরভাবে লক্ষ করলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, এই সবগুলো ঘটনার সুতো বাঁধা রয়েছে একটি একক ও গভীর সংকটের কেন্দ্রে। এটি কোনো সাময়িক আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যা নয়; বরং এটি ইউরোপীয় ‘কল্যাণকামী রাষ্ট্র’ ধারণার এক গভীর কাঠামোগত সংকট।
বিশ্বায়ন, প্রযুক্তির দ্রুত রূপান্তর এবং সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে সমাজবিজ্ঞান এবং অর্থনীতির আলোকেই কেবল বোঝা সম্ভব—কেন ইউরোপের এই নতুন প্রজন্ম আজ দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার অনুভূতিতে ভুগছে এবং কেন তাদের এই ক্ষোভ রাজপথে আছড়ে পড়ছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে চলমান এই অসন্তোষের পেছনে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিয়ামক কাজ করছে, যা গত কয়েক বছরে তীব্র থেকে তীব্রতর হয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ইউরোপের জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে মারাত্মক আঘাত হেনেছে। মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে গ্রাস করে নিয়েছে, অথচ সেই তুলনায় সাধারণ চাকরিজীবী বা তরুণদের মজুরি বাড়েনি। ফলে মাসশেষে হিসাব মেলাতে গিয়ে চরম হিমশিম খাচ্ছে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। এর সাথে যুক্ত হয়েছে তীব্র আবাসনসংকট।
বার্সেলোনা, মাদ্রিদ কিংবা লিসবনের মতো শহরগুলোতে সাধারণ মানুষের জন্য একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নেওয়া এখন প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। পর্যটন ব্যবসার প্রসার এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কারণে আবাসনখাতের মূল্য এখন স্থানীয়দের নাগালের বাইরে। বহু তরুণ শিক্ষার্থী ও তরুণ কর্মজীবী আজ রাস্তায় বা তাঁবুতে রাত কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন, কারণ তাদের উপার্জনের সিংহভাগ দিয়েও একটি ঘরের ভাড়া মেটানো সম্ভব হচ্ছে না।
২০২৬ সালের অক্টোবর মাসের সুনির্দিষ্ট চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইউরোপের অন্তত সাতটি দেশে বড় ধরনের বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। কোনো দেশে বড় বিক্ষোভ হওয়া মানেই তা প্রতিদিন একইভাবে চলছে তা নয়, তবে আন্দোলনের মূল দাবিগুলো লক্ষ্য করলে দুটি ধারা স্পষ্ট হয়—সাধারণ সামাজিক-অর্থনৈতিক আন্দোলন এবং শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন ছাত্র আন্দোলন। ফ্রান্সে স্কুলের অব্যবস্থাপনা, তীব্র শিক্ষকসংকট, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর চাপ, জীবনযাত্রার ব্যয় ও সরকারি বাজেট ছাঁটাইয়ের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থী ও সাধারণ জনগণ রাজপথে নেমেছে, যা কিছু স্থানে সহিংস সংঘর্ষ ও গ্রেপ্তারের রূপ নিয়েছে। আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানায় দুর্নীতি, কর্মসংস্থানের চরম অভাব এবং শিক্ষার মান নিয়ে ক্ষোভ থেকে ব্যাপক ছাত্র-অংশগ্রহণে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলছে।
ইতালির মিলান, রোম ও তুরিনসহ বিভিন্ন শহরে জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বাজেট হ্রাস এবং যুদ্ধ ও সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির নীতির প্রতিবাদে ছাত্র ও শ্রমিকদের যৌথ বিক্ষোভ দেখা গেছে। বেলজিয়ামের ব্রাসেলস ও লিয়েজে শিক্ষা খাতে ব্যয় হ্রাস, বিদ্যালয়ের জীর্ণ অবকাঠামো এবং সরকারি বাজেট কাটছাঁটের প্রতিবাদে শিক্ষার্থী ও শ্রমিক সংগঠনগুলো রাজপথে সোচ্চার হয়েছে। গ্রিসের এথেন্সসহ বিভিন্ন শহরে প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থী ও শিক্ষক শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ উন্নয়ন ও অতিরিক্ত শিক্ষার্থীর চাপ কমানোর দাবিতে বিশাল বিক্ষোভ মিছিল করেছেন।
- ট্যাগ:
- মতামত
- সংকট
- জীবনযাত্রা
- ইউরোপের অভিবাসী