কেবলমাত্র নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারই অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে পারে
সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনের এক বছরও পার হয়নি। তাহলে এখনই কেন পরবর্তী নির্বাচনের আলাপ? কারণ, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া চলছে। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অগ্রগতি। কেননা, অতীত অভিজ্ঞতা আমাদের বারবার দেখিয়েছে, কেবল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করা সম্ভব।
জামায়াতের দাবি, তারা এই ব্যবস্থার মূল প্রবক্তা। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার পক্ষে রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তোলা ও এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ভূমিকা রেখেছিল। আর ১৯৯৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে খালেদা জিয়ার সরকারের অধীনে বিএনপি এই ব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে। ফলে, তিনটি দলই এর কৃতিত্ব দাবি করতে পারে।
এ প্রসঙ্গে ইতিহাসের সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার দাবিতে পুরো দেশকে কার্যত জিম্মি করে ফেলেছিল আওয়ামী লীগ। ১৯৯৪ সাল থেকে এ ব্যবস্থা মেনে নিতে বিএনপি সরকারকে বাধ্য করার চেষ্টা করতে থাকে দলটি। তারা একের পর এক হরতালের ডাক দেয়। সংসদে প্রথমে শুরু হয় ওয়াকআউট, যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দীর্ঘ হতে থাকে। এরপর বিভিন্ন সময়ে সংসদ বর্জন করে। শেষ পর্যন্ত পুরো বিরোধী দল পদত্যাগ করে এবং এর ফলে সংসদ সম্পূর্ণ একতরফা ও কার্যত অকার্যকর হয়ে যায়।
তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল বিএনপি এই পরিবর্তনের পক্ষে জনসমর্থন গ্রাহ্য না করে বিদ্যমান ব্যবস্থাতেই ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন আয়োজন করে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সব বিরোধী দল, দলীয় সরকারের অধীনে সেই নির্বাচন বর্জন করে।
ওই নির্বাচনে জিতলেও পরবর্তীতে বিএনপি সম্ভবত জনমত বুঝতে পেরেছিল। এর জন্য সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চালু করে এবং একই বছর জুনে আরেকটি নির্বাচন আয়োজন করে। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হয়। এর মধ্য দিয়ে ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর ক্ষমতাচ্যুত হওয়া দলটি ২১ বছর পর ক্ষমতায় আসে।
এর আগে ১৯৯১ সালের নির্বাচনটি হয়েছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে। সব রাজনৈতিক দলের সমঝোতার ভিত্তিতে সেই সরকারের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদ।
১৯৯৬ সালের জুন থেকে শুরু করে ২০১১ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাতিল হওয়ার আগ পর্যন্ত সব নির্বাচনই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার অধীনেই হয়েছে। এসব নির্বাচনে পরাজিত দলগুলো সবসময়ই সমালোচনা করেছে, নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়নি। কিন্তু, ফলাফল মেনে নিয়েছে, সরকার গঠনকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং সংসদের কার্যক্রমে অংশ নিয়েছে।
১৯৯১ সালে জেনারেল এরশাদের পতনকে আমাদের গণতান্ত্রিক যাত্রার পুনরারম্ভ বলা যায়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চালু এবং সংসদীয় পদ্ধতি পুনঃপ্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে আমাদের সামনে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার এক বিরল ও ঐতিহাসিক সুযোগ এসেছিল। বিশেষ করে নির্বাচন কমিশন ও বিচার বিভাগসহ সব ‘জবাবদিহিমূলক’ প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার সুযোগ ছিল। গণতন্ত্রকে কার্যকরভাবে পরিচালিত করতে এসব প্রতিষ্ঠানের স্বায়ত্তশাসন ছিল পূর্বশর্ত।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে আমাদের রাজনীতিবিদরা তা উপলব্ধি করতে পারেননি। জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার বদলে উল্টো দলীয়করণ করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে আমলাতন্ত্র ও পুলিশ। বিচার বিভাগও রেহাই পায়নি। ক্ষমতাসীনদের স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় জবাবদিহির আওতায় রাখতে হবে—এই মৌলিক নীতি আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো কখনোই মেনে নেয়নি।
১৯৯৬ সালের জুন, ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনের পরও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে ভিত্তিহীন প্রশ্ন তোলা হয়েছে কোনো প্রমাণ ছাড়াই। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে এই সমঝোতা যে, প্রধানমন্ত্রীর পদমর্যাদায় এই সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হবেন সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি। এই পদ্ধতিতে প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব পালন করেন বিচারপতি হাবিবুর রহমান। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হয়। কিন্তু ২০০১ সালে একই পদ্ধতিতে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পরাজিত হলে প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি লতিফুর রহমানের মেয়াদ নিয়ে দলটি ব্যাপক আপত্তি তোলে।