জাপান-বাংলাদেশ কার্যকর অংশীদারত্ব প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার গঠনের পর মালয়েশিয়া এবং চীনের পর দ্বিপক্ষীয় সফরে জাপানকে বেছে নেওয়ার কারণটি এখন স্পষ্ট। প্রতিবেশী ভারতের প্রত্যাশা ছিল প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফরটি যেন সেদেশে হয়।
বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতার এই সময়ে যখন সব দেশই নিজেদের অর্থনৈতিক সংকট কাটাতে নানা কৌশল অবলম্বন করছে, বাংলাদেশের সরকারের পক্ষ থেকে এই সংকট কাটাতে যে বিষয়গুলোর প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে সেগুলো হচ্ছে জ্বালানি সমস্যার সমাধান, বিদেশি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিশ্চিতকরণের উপর, উল্লেখ্য মালয়েশিয়া এবং চীন সফরেও উল্লিখিত বিষয়গুলোর ওপরই সরকারের অধিক মনোযোগ পরিলক্ষিত হয়েছে।
৪ দিনের সফরের দ্বিতীয় দিনে ২৭ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর সাথে আনুষ্ঠানিক বৈঠক হয় জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির। মধ্যাহ্নভোজের মধ্য দিয়ে শেষ হওয়া এই বৈঠক সার্বিকভাবে বাংলাদেশের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটাতে পেরেছে বলে মনে করা যায়।
স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের সাথে নিরবচ্ছিন্নভাবে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে জাপানের। দেশের নানা অবকাঠামো উন্নয়নসহ অর্থনৈতিক উন্নয়নে জাপান বরাবরই উদারভাবে সহায়তা দিয়েছে বাংলাদেশকে। সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী যে চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করছেন সেগুলোর ওপর ভিত্তি করেই তার সাম্প্রতিক সফরগুলো পরিচালিত হয়েছে।
সেদিক দিয়ে তার এবারের জাপান সফরের প্রধান লক্ষ্য ছিল মূলত অধিক হারে জাপানের বিনিয়োগ আকর্ষণ। এর সাথে উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশের অপরিহার্যতাকে জাপানের সামনে তুলে ধরে আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা। এদিক দিয়ে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সাথে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকটি বাংলাদেশের প্রত্যাশাকে পূরণ করেছে।
দুই দেশের সরকার প্রধানের মধ্যকার বৈঠকে ৪টি সমঝোতা স্মারকের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় জরুরি সহায়তা বাবদ ৩২ কোটি মার্কিন ডলার প্রাপ্তির আশ্বাস। জাপানের পার্টনারশিপ ফর পাওয়ার এশিয়া উদ্যোগের আওতায় এই জরুরি সহায়তা আমাদের জ্বালানি সংকট নিরসনের মাধ্যমে ভোক্তা পর্যায়ের পাশাপাশি উৎপাদন ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে বিদেশি বিনিয়োগকে আরও আকর্ষণীয় করতে পারে।
সেই সাথে মাতারবাড়ি কয়লাভিত্তিক জ্বালানি প্রকল্পে জাপানের সহায়তার বিষয়েও নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে। সবমিলিয়ে এই সফরে সরকারি পর্যায়ে ৪টি এবং বেসরকারি পর্যায়ে ১৭টি সমঝোতা স্মারক ছাড়াও ২টি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যার মধ্যে ২৯৫ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার ঋণ চুক্তি এবং উপকূলীয় নিরাপত্তায় ১৩ দশমিক ৪৪ মিলিয়ন ডলারের অনুদান চুক্তি রয়েছে।
এই বৈঠকে আগামী পাঁচ বছর সময়ে জাপানের বেসরকারি খাত থেকে ১৭টি সমঝোতা স্মারকের আওতায় ৬৩০ কোটি ডলার বিনিয়োগের বিষয়ে নিশ্চয়তা এসেছে। ধারণা করা হচ্ছে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার এলাকা ছাড়াও আরও কিছু জাপানি শিল্পাঞ্চল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এই বিনিয়োগ দেশের কমপক্ষে ২ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করবে, যা বেকার সমস্যা সমাধান এবং আমাদের উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ভবিষ্যতে আরও অধিক হারে জাপানি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে পারে। দুই দেশের সরকার প্রধানের মধ্যকার এই বৈঠক ঘিরে উভয় দেশের মধ্যে উন্নয়নের নতুন ক্ষেত্রে অন্বেষণের তাগিদ লক্ষণীয় ছিল।
উভয় দেশের সরকার প্রধানই তাদের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রায় অভিন্ন পোস্ট দিয়েছেন। এক্ষেত্রে জাপানের প্রধানমন্ত্রী তার পোস্টে বাংলাদেশের নতুন সরকারের সাথে দ্বিপক্ষীয় অংশীদারত্বকে আরও জোরদার করতে বাংলাদেশের আগ্রহের বিষয়টিকে প্রশংসা করে মুক্ত এবং অবাধ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল (এফওআইপি) এবং দুই দেশের সহযোগিতার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বঙ্গোপসাগরীয় শিল্প প্রবৃদ্ধি অঞ্চল বা বিগ-বি উদ্যোগকে আরও এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে দুই দেশ একমত হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন।