শৈশব কেন বড় হওয়ার পর আরও সুন্দর হয়ে ওঠে
“বয়স তখন ছিল কাঁচা—হাল্কা দেহখানা
ছিল পাখির মতো, শুধু ছিল না তার ডানা।”
-বালক, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
শৈশবের সময়টাকে আমরা তখন খুব একটা বুঝতে পারি না। তখন মনে হয়, বড় হলেই জীবন সুন্দর হবে। নিজের মতো করে চলব, কারও বকুনি শুনতে হবে না, ইচ্ছেমতো ঘুরব, রাত জাগব, টাকা উপার্জন করব, নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নেব। অথচ বয়স যখন সত্যিই বড় হয়ে যায়, তখন হঠাৎ একদিন পেছনে তাকিয়ে মনে হয়—জীবনের সবচেয়ে স্বাধীন সময়টি তো আসলে সেই শৈশবেই ছিল। যে দিনগুলোকে তখন একঘেয়ে মনে হতো, আজ সেগুলোই স্মৃতির সবচেয়ে উজ্জ্বল জানালা।
শৈশবের সৌন্দর্য সম্ভবত এখানেই—তখন আমরা সৌন্দর্যের মূল্য বুঝতাম না। আর বড় হয়ে সেই সৌন্দর্যের মূল্য বুঝি, কিন্তু তাকে আর ফিরে পাই না।
গ্রামের মেঠোপথ, বর্ষার কাদামাটি, বিকেলের মাঠ, স্কুল ছুটির পর বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, পুকুরে ঝাঁপ দেওয়া, শীতের সকালে রোদ পোহানো, ঈদের নতুন জামা, পূজার আনন্দ, মায়ের হাতে রান্না করা সাধারণ খাবার কিংবা সন্ধ্যার পর পড়তে বসার জন্য মায়ের ডাক—এসবের কোনোটিই তখন অসাধারণ বলে মনে হতো না। জীবন ছিল এত সহজ যে সহজতাকেই আমরা স্বাভাবিক ধরে নিয়েছিলাম।আজ সেই স্বাভাবিকতাই হয়ে উঠেছে দুর্লভ।মানুষের স্মৃতির একটি অদ্ভুত স্বভাব আছে। সময় যত দূরে সরে যায়, কিছু দৃশ্য তত উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। মনোবিজ্ঞানে আত্মজীবনীমূলক স্মৃতির আলোচনায় দেখা যায়, জীবনের কৈশোর ও তরুণ বয়সের কিছু অভিজ্ঞতা মানুষের স্মৃতিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় আবেগ, পরিচয় গঠন এবং জীবনের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সময়কাল। ফলে বহু বছর পরেও শৈশবের একটি গন্ধ, একটি গান, একটি বাড়ির উঠান কিংবা কারও কণ্ঠস্বর হঠাৎ অতীতের দরজা খুলে দিতে পারে।
শৈশব তাই শুধু বয়সের একটি পর্যায় নয়; এটি মানুষের ভেতরে জমে থাকা একটি ভূগোল।
সেই ভূগোলে হয়তো একটি ছোট্ট বাড়ি আছে। উঠানে একটি আমগাছ। পাশ দিয়ে সরু রাস্তা। বিকেলে কয়েকজন বন্ধু। দূরে আজানের ধ্বনি। কোথাও একজন মা সন্তানকে ঘরে ফেরার জন্য ডাকছেন। সেই দৃশ্যের অর্থ তখন বোঝা হয়নি। কিন্তু জীবনের বহু বছর পর সেই দৃশ্যই বুকের ভেতর অদ্ভুত এক শূন্যতা তৈরি করে। কারণ আমরা তখন বুঝতে পারি, দৃশ্যটি শুধু একটি দিনের ছিল না; সেটি ছিল আমাদের জীবনের এমন একটি সময়ের প্রতীক, যা আর কখনো ফিরে আসবে না।
শৈশবের আরেকটি সৌন্দর্য ছিল প্রয়োজনের সীমাবদ্ধতা। আমাদের চাহিদা ছিল ছোট। একটি নতুন বল, একটি গল্পের বই, একটি ঘুড়ি, একটি সাইকেল, বন্ধুর বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া—এই সামান্য আনন্দগুলোই দিনকে উৎসবে পরিণত করতে পারত। এখন আমাদের হাতে অনেক কিছু, কিন্তু আনন্দের পরিমাণ কি সেই অনুপাতে বেড়েছে?
বরং আধুনিক জীবনের এক বড় সংকট হলো—আমরা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কিছু অর্জন করছি, কিন্তু বিস্মিত হওয়ার ক্ষমতা হারাচ্ছি।
শৈশবের একটি বিকেল ছিল দীর্ঘ। এখন একটি বছর কেটে যায় চোখের পলকে। তখন সময়কে আমরা ভোগ করতাম; এখন সময়কে আমরা তাড়া করি। তখন ছুটির দিন মানে ছিল বাইরে যাওয়া, খেলাধুলা, গল্প করা। এখন ছুটির দিনও অনেকের কাছে কাজের অসমাপ্ত তালিকা, মোবাইলের পর্দা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং নানা ধরনের মানসিক ব্যস্ততায় আটকে থাকে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- শৈশব কাল
- আধুনিক জীবনযাপন