পরিচ্ছন্ন দেশ চাই, কিন্তু নিজেকে বদলাতে চাই না
পরিচ্ছন্ন, সুন্দর ও বাসযোগ্য একটি দেশ কে না চায়? আমরা সবাই চাই আমাদের শহর, গ্রাম, রাস্তাঘাট, ফুটপাত, পার্ক, নদী, জলাশয় পরিচ্ছন্ন থাকুক। রাস্তায় বের হলে চারপাশে চোখে পড়ুক পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, সবুজ গাছপালা, সুন্দর ফুটপাত এবং পরিকল্পিত নগরজীবনের ছাপ। বিদেশের কোনো উন্নত দেশে গেলে সেখানকার পরিচ্ছন্ন রাস্তাঘাট, সুশৃঙ্খল জনজীবন ও পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনা দেখে আমরা মুগ্ধ হই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেসব দেশের ছবি, ভিডিও দেখে প্রশংসা করি। আক্ষেপ করে বলি, আমাদের বাংলাদেশ কেন এমন হতে পারে না? কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছি, আমাদের চারপাশের পরিবেশ নোংরা হওয়ার পেছনে আমাদের নিজেদের ভূমিকা কতটা? আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি, যে পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশের স্বপ্ন আমরা দেখি, সেই বাংলাদেশকে অপরিচ্ছন্ন করে তোলার কাজে নিজেরাই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অংশ নিচ্ছি কি না?
একটি সাধারণ দৃশ্য কল্পনা করুন। একজন মানুষ পান চিবুতে চিবুতে রাস্তা দিয়ে হাঁটছেন। পান চিবানো তার ব্যক্তিগত অভ্যাস, এতে আপত্তির কিছু নেই। কিন্তু হাঁটতে হাঁটতে তিনি যদি রাস্তার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত পানের পিক ফেলতে থাকেন, তাহলে বিষয়টি আর ব্যক্তিগত অভ্যাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও নাগরিক শিষ্টাচারের পরিপন্থি আচরণ। তার ফেলে যাওয়া পানের পিক অন্য পথচারীর জুতা, পোশাক কিংবা চলাচলের পথে পড়তে পারে। ফুটপাত ও সড়কের সৌন্দর্য নষ্ট হয়, পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের বাড়তি পরিশ্রম করতে হয়। অথচ লোকটি হয়তো একবারও ভাবছেন না, তার এই সামান্য অসতর্কতা অন্য মানুষের জন্য কতটা বিরক্তিকর এবং পরিবেশের জন্য কতটা ক্ষতিকর।
একইভাবে, কেউ রিকশায় বা বাসে বসে পানি পান করছেন। তৃষ্ণা মেটাতে পানি পান করা স্বাভাবিক। কিন্তু বোতলের পানি শেষ হওয়ার পর সেটি রাস্তার ওপর ছুড়ে ফেললে, তার ব্যক্তিগত স্বস্তির মূল্য দিতে হয় পুরো সমাজকে। প্লাস্টিকের বোতল বছরের পর বছর পরিবেশে থেকে যেতে পারে। নালা-নর্দমায় জমে পানি চলাচলে বাধা সৃষ্টি করতে পারে এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। অথচ বোতলটি হাতে রেখে নির্ধারিত ডাস্টবিনে ফেলা কিংবা উপযুক্ত স্থানে বর্জ্য জমা দেওয়া খুব কঠিন কোনো কাজ নয়। কয়েক সেকেন্ডের সচেতনতা দিয়েই এ ধরনের সমস্যা এড়ানো সম্ভব।
গাড়িতে বসে চিপস, বিস্কুট কিংবা অন্য কোনো খাবার খাওয়ার অভ্যাসও অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু খাবার শেষ করে গাড়ির জানালা খুলে খালি প্যাকেটটি রাস্তায় ছুড়ে ফেলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। গাড়িটি ব্যক্তিগত হতে পারে, কিন্তু গাড়ির জানালা দিয়ে ফেলে দেওয়া ময়লা জমা হয় সবার ব্যবহারের রাস্তায়। গাড়ির ভেতর পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য যে মানুষটি যত্নবান, তিনিই যদি বাইরের পরিবেশ নোংরা করতে দ্বিধা না করেন, তাহলে তার পরিচ্ছন্নতাবোধের যথার্থতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। নিজের ঘর পরিষ্কার রাখব, অথচ ঘরের বাইরের পরিবেশ নোংরা করব—এমন মানসিকতা কোনোভাবেই প্রকৃত পরিচ্ছন্নতার পরিচয় হতে পারে না।
বাড়ির ময়লা-আবর্জনা ব্যবস্থাপনায়ও আমাদের মধ্যে একই ধরনের অসচেতনতা দেখা যায়। অনেকে ঘরের ময়লা সুন্দরভাবে একটি পাত্রে জমা করেন। কিন্তু সেই ময়লা নির্ধারিত স্থানে না ফেলে রাস্তার পাশে, খালি জায়গায় কিংবা নর্দমার মধ্যে ফেলে রাখেন। কেউ কেউ আবার রাতের অন্ধকারে কিংবা ভোরবেলায় বাড়ির সামনের ময়লা অন্যের বাড়ির সামনে ফেলে দিয়ে দায়িত্ব শেষ হয়েছে বলে মনে করেন। যেন নিজের বাড়ির সীমানা অতিক্রম করলেই ময়লাটি আর তার নয়! অথচ বর্জ্য কোথায় ফেলা হচ্ছে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আরও সমস্যা হলো, অনেকে ড্রেনকে ময়লা ফেলার উপযুক্ত স্থান মনে করেন। প্লাস্টিকের প্যাকেট, পলিথিন, খাবারের উচ্ছিষ্টসহ নানা ধরনের বর্জ্য ড্রেনে ফেলে দেন। তাদের ধারণা, পানি এসব ময়লা ভাসিয়ে নিয়ে চলে যাবে। কিন্তু ড্রেন কোনো আবর্জনা বহনকারী নদী নয়। ড্রেনে বর্জ্য জমে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হয়, জলাবদ্ধতা বাড়ে এবং পরিবেশ দূষিত হয়। বর্ষা মৌসুমে সামান্য বৃষ্টিতেই অনেক এলাকায় পানি জমে যাওয়ার পেছনে অপর্যাপ্ত নিষ্কাশনব্যবস্থার পাশাপাশি নালা-নর্দমায় বর্জ্য জমে থাকারও ভূমিকা থাকে। ফলে যিনি ড্রেনে একটি পলিথিন ফেলছেন, তিনি হয়তো বুঝতেই পারছেন না, তার এই ছোট কাজটি বৃহত্তর সমস্যার অংশ হয়ে উঠতে পারে।
আমাদের দেশে হরহামেশাই দেখা যায়, একজন মানুষ ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে প্রস্রাবের বেগ অনুভব করলেন। আশপাশে উপযুক্ত শৌচাগার খোঁজার পরিবর্তে তিনি রাস্তার পাশের কোনো দেয়ালে দাঁড়িয়ে কাজটি সেরে ফেললেন। হয়তো মনে করলেন, এতে এমন কী হয়েছে! কিন্তু সেই দেয়ালের পাশ দিয়েই প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ চলাচল করেন। দুর্গন্ধ ছড়ায়, পরিবেশ নোংরা হয় এবং পথচারীদের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি হয়। নিজের সাময়িক সুবিধার জন্য অন্যের স্বাভাবিক চলাচল ও স্বস্তিকে উপেক্ষা করার নাম নাগরিক স্বাধীনতা নয়; এটি দায়িত্বহীনতা।
এসব আচরণের পেছনে একটি সাধারণ মানসিকতা কাজ করে—‘আমি একা করলে কী আর হবে?’ কিংবা ‘একটু ময়লা ফেললে এমন কী ক্ষতি হবে?’ কিন্তু সমাজের প্রতিটি মানুষ যদি একই যুক্তিতে কাজ করেন, তাহলে পরিণতি কী হয়, ভেবে দেখেছেন? একজন পানের পিক ফেললেন, আরেকজন পানির বোতল ফেললেন, তৃতীয়জন খাবারের প্যাকেট ছুড়লেন, চতুর্থজন ড্রেনে ময়লা ফেললেন, পঞ্চমজন রাস্তার পাশে প্রস্রাব করলেন। এভাবে হাজার হাজার মানুষের সামান্য অসচেতনতা মিলেই একটি শহরকে অপরিচ্ছন্ন করে তোলে। যে কাজটি একজনের কাছে তুচ্ছ, সেটিই সম্মিলিতভাবে বড় সামাজিক সমস্যায় পরিণত হয়। তাই ‘আমি একা করলে কী হবে’—এই যুক্তি আসলে দায়িত্ব এড়ানোর একটি অজুহাত মাত্র।