তরল শ্রমের যুগে কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষা
স্থিরতার ছদ্মবেশে আমাদের চারপাশের বিশ্বচরাচর প্রতিনিয়ত অস্থির ঘূর্ণিপাকে ঘুরছে। এটি কেবল বিশ্ব গোলকের আবর্তন নয়; নয় রাজনৈতিক তর্কের কোলাহল কিংবা অর্থনৈতিক গ্রাফের ওঠানামার হিসাব। এ অস্থিরতা দৃশ্যমান খোদ মানুষের যাপিত জীবন, তার দৈনন্দিন শ্রম, সম্পর্ক ও অস্তিত্বের লড়াইয়ের সূক্ষ্ম সামাজিক প্রক্রিয়ায়। পোলিশ সমাজবিজ্ঞানী জিগমুন্ট বাউম্যান এ প্রবণতাকে চিহ্নিত করেছিলেন লিকুইড মডার্নিটি বা তরল আধুনিকতা বলে। এটি এমন এক সমাজ পরিবেশ, যেখানে যেকোনো স্থায়ী প্রতিষ্ঠান, মানবীয় সম্পর্ক, নিজস্ব পরিচয় এবং কাজের নিশ্চয়তা চোখের পলকে নিজের রূপ বদলে ফেলে। উষ্ণ মোম বা জলের মতো যার কোনো নির্দিষ্ট আকার নেই। কোনো দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকারের পরিবর্তে সম্পর্কগুলো তৈরি হচ্ছে শর্তহীনতার শর্তে; টিকে আছে আরোপিত নমনীয়তা ও আপসে। ফলত নিশ্চিত আশ্রয়ের জায়গায় দেখা দিচ্ছে অচেনা অনিশ্চয়তা।
শ্রমিকের যে শ্রম একসময় কারখানা প্রাঙ্গণে নির্দিষ্ট সময়সীমায়, দৃশ্যমান মালিকের চোখরাঙানি কিংবা চুক্তির অধীনে বাঁধা ছিল, উত্তরাধুনিক পুঁজি তাকে ধোঁয়াশার মতো বায়বীয় করে দিয়েছে। চাকরির শর্ত, স্থায়িত্ব, কর্মপদ্ধতির রূপান্তর, দক্ষতার পরিবর্তনশীল চাহিদা, অনিশ্চয়তা, প্রতিশ্রুতিহীনতা—এসব মিলে কোনটা চাকরি, কোনটা বেকারত্ব, কোনটা উদ্যোগ আর কোনটা ফ্রিল্যান্সিং বোঝা দুষ্কর। এ তরল শ্রমের যুগে বিদ্যমান কর্মসংস্থান সংকটকে বুঝতে হলে কেবল বেকারত্বের সরকারি পরিসংখ্যান দেখলে চলবে না। সমস্যাটিকে বুঝতে হবে কাজের ধরন, মান, শারীরিক ও সামাজিক নিরাপত্তা, আত্মমর্যাদা ও ভবিষ্যতের সার্বিক অনিশ্চয়তা সমেত।
- ট্যাগ:
- মতামত
- কর্মসংস্থান