পাহাড়ের ভঙ্গুর নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন উদ্বেগ
আবার পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। ২০২৪ সালের এপ্রিলের থানচি হামলা ছিল ২-৩ এপ্রিল সংঘটিত ব্যাংক লুট, অস্ত্র ছিনতাই ও সংশ্লিষ্ট হামলার ধারাবাহিকতার অংশ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ঘটনাগুলোর সঙ্গে পাহাড়ি সংগঠন কেএনএফের সংশ্লিষ্টতার কথা জানিয়েছিল তখন। ২০২৬ সালের অক্টোবরে সাজেকে গোলাগুলির ঘটনা পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা-ভঙ্গুরতার ধারাবাহিক সংকেত দিচ্ছে। এ ঘটনায় দায়ী করা হচ্ছে আরেক পাহাড়ি দল ইউপিডিএফ সংগঠনকে। ফলে পাহাড়ের নাজুক নিরাপত্তা সংকটকে নিছকই দুর্গম সীমান্ত অঞ্চলের বিচ্ছিন্ন সমস্যা হিসাবে খণ্ডিত অবয়বে দেখার সুযোগ নেই। থানচির দুই বছর পর সাজেকের ঘটনাটি পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা সংকটকে আরও স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান করেছে। অবরোধের মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৯৩৩ পর্যটককে নিরাপত্তা বাহিনীর সহায়তায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এ সময় উজোবাজার এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে গোলাগুলির খবর পাওয়া যায়। ঘটনাগুলোর তাৎপর্য কেবল পর্যটন বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। এগুলো দেখাচ্ছে, পাহাড়ে নিরাপত্তা, শাসন, উন্নয়ন, জাতিগত সম্পর্ক, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক আস্থার প্রশ্ন পরস্পর থেকে আলাদা করা যাচ্ছে না, যা জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোর আওতায় এনে যথোপযুক্ত ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রশমন করা জরুরি।
পার্বত্য চট্টগ্রামের থানচি ও সাজেকের সশস্ত্র হামলার ঘটনাগুলো সেখানকার নিরাপত্তা অবকাঠামোর নানাবিধ দুর্বলতা তুলে ধরেছে। ব্যাংক, থানা বা সরকারি স্থাপনায় আক্রমণ কেবল অর্থ বা অস্ত্র লুটের ঘটনা নয়, সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা এবং জনগণের আস্থার ওপর আঘাত এবং প্রশাসনকে চ্যালেঞ্জ জানানোর শামিল। এর ফলে তিনটি ঝুঁকি তৈরি হয় : এক. সাধারণ নাগরিক ও পর্যটকদের সরাসরি নিরাপত্তা ঝুঁকি। দুই. স্থানীয় অর্থনীতি ও পর্যটন শিল্পের ক্ষতি। তিন. পাহাড়ের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উদ্বেগ।
সশস্ত্র আক্রমণের মধ্যেই পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া তাৎক্ষণিক সাফল্য হলেও দীর্ঘমেয়াদি প্রশ্ন হলো-কেন এত মানুষ এমন একটি এলাকায় প্রবেশ করলেন, যেখানে নিরাপত্তা ঝুঁকি সম্পর্কে পর্যাপ্ত আগাম সতর্কতা ছিল না? কেন নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার প্রশ্নে স্থানীয় প্রশাসন, পর্যটন ব্যবসায়ী ও নিরাপত্তা সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় আগে থেকে দৃশ্যমান ছিল না? এসব দুর্বলতা দূর করা দরকার। একইসঙ্গে এসব ঘটনায় পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান নিরাপত্তা সংকটকে তিনটি স্তরে দেখা দরকার। প্রথমত, সশস্ত্র সক্ষমতার বিস্তার। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো যদি ব্যাংক, থানা, নিরাপত্তা চৌকি বা সড়কপথে আক্রমণ চালাতে সক্ষম হয়, তাহলে তাদের সংগঠন, অস্ত্র, অর্থায়ন, চলাচল ও যোগাযোগব্যবস্থা সম্পর্কে নতুন করে মূল্যায়ন প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে শুধু অভিযান চালালেই হবে না। জানতে হবে : অস্ত্র কোথা থেকে আসছে? অর্থায়নের উৎস কী? সীমান্তপথে চলাচল কীভাবে হচ্ছে? স্থানীয় সহযোগী নেটওয়ার্ক আছে কিনা? সংঘাতপূর্ণ এলাকায় কারা তথ্য সরবরাহ করছে? পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি কীভাবে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ব্যবহার করছে? দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক আস্থার সংকট। পাহাড়ে নিরাপত্তা সমস্যা কেবল বন্দুক দিয়ে তৈরি হয় না; রাজনৈতিক উসকানি, নানামুখী বিরোধ, পরিচয়গত অনিরাপত্তা, উন্নয়নের অসমতা এবং প্রশাসনের প্রতি অবিশ্বাসও সংঘাতের পরিবেশ তৈরি করে। সব পাহাড়ি জনগোষ্ঠী সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত নয়-এ মৌলিক সত্য মেনে নিয়েও স্বীকার করতে হবে, নানা জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে সশস্ত্র-সন্ত্রাসীরা লুক্কায়িত রয়েছে, যা স্থানীয় জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসযোগ্য রাজনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে চিহ্নিত ও নির্মূল করা জরুরি। এ কাজে কারবারি, হেডম্যান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, নারী প্রতিনিধি, তরুণ, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, ধর্মীয় নেতা এবং নাগরিক সমাজকে বৃহত্তর নিরাপত্তা আলোচনার অন্তর্ভুক্ত করাও অপরিহার্য। তৃতীয়ত, সীমান্ত ও আঞ্চলিক মাত্রা। বান্দরবান ও পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি বড় অংশ সীমান্তসংলগ্ন। সীমান্তের ওপারে সংঘাত, সশস্ত্র গোষ্ঠীর চলাচল, মাদক, অবৈধ অস্ত্র, মানব পাচার ও অনিয়ন্ত্রিত যোগাযোগ স্থানীয় নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করতে পারে।
সীমান্ত নিরাপত্তাকে শুধু প্রহরা ও চৌকি দিয়ে দেখা যাবে না। এজন্য প্রয়োজন: সীমান্ত গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়। বিজিবি, সেনাবাহিনী, পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত কমান্ড। সীমান্তবর্তী জনগণের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ। বৈধ বাণিজ্য ও যোগাযোগের সুযোগ। অবৈধ অর্থপ্রবাহ ও অস্ত্রপথ শনাক্তকরণ। প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ। তাছাড়া, সীমান্ত অঞ্চলের জনগণকে নিরাপত্তার অংশীদার না করে সমস্যার মূলে আঘাত হানা অসম্ভব। ইতোমধ্যে সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর যৌথ অভিযান পরিচালনার কথা জানা গেছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনসম্মত অভিযান অবশ্যই প্রয়োজন। সশস্ত্র হামলা, ব্যাংক লুট, অপহরণ, অস্ত্র ছিনতাই, সাধারণ মানুষকে জিম্মিকরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তবে, পাহাড়ে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার জন্য নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে একসঙ্গে কাজে লাগাতে হবে। যেমন-সশস্ত্র হামলা ও অপরাধের বিরুদ্ধে লক্ষ্যনির্দিষ্ট অভিযান। নিরপরাধ নাগরিকের সুরক্ষা ও মানবাধিকার নিশ্চিতকরণ। আটক ও অভিযানের আইনি প্রক্রিয়ার চলমানতা। সিভিল সোসাইটি ও স্থানীয় জনগণের সঙ্গে নিরাপত্তা সংলাপ। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সমন্বয়। মূল কথা হলো, আইনসম্মত, অংশগ্রহণমূলক ও জবাবদিহির কার্যক্রমই দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করতে সক্ষম।
থানচি ও সাজেকের তিক্ত ও নিরাপত্তা হানিকর অভিজ্ঞতার পটভূমিতে কালবিলম্ব না করেই পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা নিশ্চিতে কেন্দ্রীয় জাতীয় মনিটরিং সেল এবং স্থানীয়ভাবে জেলা প্রশাসন, পুলিশ, সেনাবাহিনী, পর্যটন কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি রিয়েল-টাইম নিরাপত্তা মূল্যায়ন ও পরিবীক্ষণ ব্যবস্থা তৈরি করা দরকার। সরকারের বিভিন্ন সংস্থার পাশাপাশি রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় সংস্থা এবং সিভিল সোসাইটি ও বুদ্ধিজীবীদের অতিদ্রুত কাজে লাগাতে হবে। কারণ, পাহাড়ের নিরাপত্তা সবার জন্যই দরকার এবং সম্মিলিতভাবে তা সুনিশ্চিত করাও সবার দায়িত্ব।