ঢাকার গৃহহীন মানুষের আবাসন নিয়ে কেন আমরা ভাবব না
মানুষের বেঁচে থাকার জন্য যেমন খাদ্য গ্রহণ ও পানি পান করা অপরিহার্য, তেমনি মলমূত্র ত্যাগ করাও একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রয়োজন। আমরা যাঁরা বাড়িতে, ফ্ল্যাটে কিংবা ভাড়া বাসায় থাকি, প্রয়োজন হলেই বাথরুমে যেতে পারি। সেখানে পানি, হাত ধোয়ার ব্যবস্থা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা থাকে। কিন্তু যাঁদের মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই, যাঁরা ফুটপাত কিংবা খোলা আকাশের নিচে রাত কাটান, তাঁদের প্রয়োজন হলে কোথাও যাওয়ার উপায় আছে? বিশেষ করে একজন গৃহহীন নারী বা কিশোরী কীভাবে জনাকীর্ণ শহরে নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে এই প্রয়োজন মেটাবেন? আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি, ঢাকা শহরের গৃহহীন মানুষগুলো কোথায় মলমূত্র ত্যাগ করেন?
প্রশ্নটি শুনতে অস্বস্তিকর। কিন্তু এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমাদের নগর-পরিকল্পনা, মানবিকতা ও জনস্বাস্থ্যের গভীর সংকট। ফুটপাত, রেলস্টেশন, পার্ক, বাজার, রেললাইনের আশপাশ এবং বিভিন্ন স্থাপনার নিচে অসংখ্য মানুষ রাত কাটান। অনেক শিশুর জন্ম ও বেড়ে ওঠা এই রাস্তাতেই। অথচ তাঁদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় ও পরিচ্ছন্ন শৌচাগারের ব্যবস্থা কোথায়?
একটু ভাবুন তো, যে শিশুটি ফুটপাতে কিংবা পার্কের কোনো কোণে জন্মগ্রহণ করছে এবং সেখানেই বেড়ে উঠছে, তার ভবিষ্যৎ কতটা নিরাপদ? নিরাপদ আশ্রয়, শিক্ষা ও পরিচর্যার অভাব একজন শিশুকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতে পারে। অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পর শাস্তি দেওয়ার পাশাপাশি তার আগেই নিরাপদ আশ্রয়, পুষ্টি, শিক্ষা ও জীবিকার সুযোগ তৈরি করা কি অধিক দূরদর্শী পদক্ষেপ নয়?
একটি নিরাপদ শহর গড়তে হলে শহরের সবচেয়ে অসহায় মানুষগুলোর নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে। তাই গৃহহীন মানুষের জন্য প্রয়োজন নিরাপদ আবাসন, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও জীবিকার সুযোগ নিশ্চিত করে একটি সমন্বিত উদ্যোগ।
যে দেশ ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় ও মানবিক সহায়তা দেওয়ার সক্ষমতা দেখিয়েছে, সেই দেশে লাখখানেক গৃহহীন মানুষের জন্য পরিকল্পিত আবাসন ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা কি অসম্ভব? দুটি পরিস্থিতির প্রেক্ষাপট অবশ্যই ভিন্ন। তবু এই অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দেয়, পরিকল্পনা ও সম্পদের যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে বড় মানবিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব। যেখানে হাজার হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়, সেখানে গৃহহীন মানুষের জন্য কয়েক হাজার কোটি টাকার একটি সমন্বিত প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করা যাবে না কেন?
সারা দেশ থেকে বিপুল মানুষ ঢাকায় আসেন। সেখানে গৃহহীন ও ছিন্নমূল মানুষেরাও থাকেন। নগরে জনসংখ্যার চাপ এড়াতে জনকল্যাণমুখী গ্রামে বা মফস্সলে উন্নয়নের দিকে মনোযোগ বাড়াতে হবে। এরপরও অনেক গৃহহীন ও ছিন্নমূল মানুষ ঢাকায় আসবেন, থেকেও যাবেন, তাঁদের কথা ভেবেই এই লেখাটি লেখা।
ঢাকার আশপাশে উপযুক্ত জমি চিহ্নিত করে জনস্বার্থে আইনসম্মত প্রক্রিয়ায় জমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে গৃহহীন ও চরম আবাসন-সংকটে থাকা মানুষের জন্য স্বল্প মূল্যের আবাসন গড়ে তোলা যেতে পারে। তবে জমি নির্বাচন করতে হবে পরিবেশগত প্রভাব, যোগাযোগব্যবস্থা, কর্মসংস্থান কেন্দ্রের দূরত্ব, নির্মাণব্যয় ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনব্যয় বিবেচনায় নিয়ে।
এই আবাসন শুধু মাথা গোঁজার ঠাঁই হবে না; সেখানে থাকতে হবে নিরাপদ পানি, পরিচ্ছন্ন শৌচাগার, পয়োনিষ্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও শিশুদের শিক্ষার ব্যবস্থা। নারী, শিশু, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী মানুষের বিশেষ প্রয়োজনও বিবেচনায় নিতে হবে। পরিবারগুলো যেন নিরাপদে বসবাস করতে পারে এবং শিশুরা যেন স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ পায়, সেটিই হতে হবে মূল লক্ষ্য।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভুলে গেলে চলবে না। ঢাকা শহরের অনেক গৃহহীন ও নিম্ন আয়ের মানুষ জীবিকার জন্য শহরের ওপর নির্ভরশীল। কেউ রিকশা চালান, কেউ হকারি করেন, কেউ নির্মাণশ্রমিক কিংবা পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করেন। এ কারণে আবাসন প্রকল্পের সঙ্গে সাশ্রয়ী পরিবহনব্যবস্থা যুক্ত করা অপরিহার্য। শ্রমজীবী মানুষের কাজের সময় অনুযায়ী রুট ও সময়সূচি নির্ধারণে সেখানে গণপরিবহন চালু করতে হবে। প্রয়োজনে সরকার ভর্তুকি দিতে পারে।
পুনর্বাসন মানে এক জায়গা থেকে মানুষকে উচ্ছেদ করে অন্য জায়গায় সরিয়ে দেওয়া নয়; বরং তাঁদের জীবনে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। তাই প্রকৃত গৃহহীন মানুষের সংখ্যা, পারিবারিক অবস্থা, জীবিকা ও আবাসনের চাহিদা নিরূপণ করে স্বচ্ছ নীতিমালার ভিত্তিতে সুবিধাভোগী নির্বাচন করতে হবে। তাঁদের মতামতও গুরুত্ব পেতে হবে। একই সঙ্গে বস্তিতে বসবাসকারী নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও নাগরিক সুবিধা উন্নত করতে হবে। যেখানে বিদ্যমান বসতি নিরাপদ করা সম্ভব নয়, সেখানে জীবিকা ও সামাজিক যোগাযোগের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- মৌলিক অধিকার
- গৃহহীন মানুষ