জাতিসংঘের ৮১ বছর: বিশ্ব কি সত্যিই আরও নিরাপদ?
একটি যুদ্ধ শেষ হয়, কিন্তু যুদ্ধের শব্দ সহজে শেষ হয় না। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকে মানুষের ঘর, স্মৃতি, শৈশব ও ভবিষ্যৎ। কোনো শিশুর কাছে ‘ভূরাজনীতি’ মানে হয়তো বাবার নিখোঁজ হয়ে যাওয়া, কোনো মায়ের কাছে ‘নিরাপত্তা’ মানে রাতের বোমাবর্ষণ থেকে সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখা। আর কোনো শরণার্থীর কাছে রাষ্ট্র মানে এমন একটি জায়গা, যেখানে একদিন তার বাড়ি ছিল।
এই পৃথিবীর এমন অসংখ্য মানুষের আশা, ভয় ও ভবিষ্যৎকে সামনে রেখেই ১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর জন্ম হয়েছিল জাতিসংঘের। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা তখনো তাজা। ৫০টি দেশের প্রতিনিধিরা সানফ্রান্সিসকো সম্মেলনে বসে এমন একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছিলেন, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আরেকটি বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকা থেকে রক্ষা করবে। সেই লক্ষ্যেই জাতিসংঘ সনদ কার্যকর হয় ২৪ অক্টোবর ১৯৪৫।
আজ ৮১ বছর পর দাঁড়িয়ে প্রশ্নটি তাই অনিবার্য—বিশ্ব কি সত্যিই নিরাপদ হয়েছে?
প্রশ্নটির উত্তর এককথায় ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’—কোনোটিই নয়।জাতিসংঘ ব্যর্থ—এ কথা যেমন ইতিহাসের প্রতি অবিচার, তেমনি জাতিসংঘ সফল—এ কথা বলাও বর্তমান বাস্তবতার প্রতি চোখ বন্ধ করা। জাতিসংঘ পৃথিবীকে যুদ্ধমুক্ত করতে পারেনি; কিন্তু যুদ্ধের মধ্যেও মানুষের জন্য একটি বৈশ্বিক নৈতিক ও কূটনৈতিক কাঠামো তৈরি করেছে। বহু সংঘাতকে আলোচনার টেবিলে এনেছে, শরণার্থীকে আশ্রয়ের অধিকার দিয়েছে, ক্ষুধা ও রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, শিশু ও নারীর অধিকারকে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে এনেছে, শান্তিরক্ষী পাঠিয়েছে এবং দুর্যোগের সময়ে কোটি মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে।কিন্তু এই সাফল্যের পাশে আজকের পৃথিবীর চিত্রটি অস্বস্তিকর।স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের হিসাবে, ২০২৫ সালে বিশ্বের সামরিক ব্যয় বেড়ে প্রায় ২ দশমিক ৮৯ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এটি টানা ১১তম বছরের মতো বৈশ্বিক সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির ঘটনা। বিশ্বের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ সামরিক খাতে যাচ্ছে।
অর্থাৎ শান্তির নামে প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ৮১তম বছরে পৃথিবী অস্ত্রের পেছনে আরও বেশি অর্থ ব্যয় করছে।
এটি নিছক একটি অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান নয়। একটি দেশ যখন অস্ত্র কেনার জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করে, তখন সেই অর্থের একটি অংশ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য, জলবায়ু অভিযোজন কিংবা সামাজিক সুরক্ষা থেকে সরে যেতে পারে। SIPRI-ও সতর্ক করেছে—সামরিক ব্যয়ের এই প্রবণতার দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্য রয়েছে।
আরেকটি সংখ্যা আরও নির্মম। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের হিসাবে, ২০২৫ সালের শেষে বিশ্বে ১১ কোটি ৭৮ লাখ মানুষ জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ছিল। তাদের মধ্যে ছিল শরণার্থী, আশ্রয়প্রার্থী এবং নিজ দেশের ভেতরে বাস্তুচ্যুত মানুষ। অর্থাৎ পৃথিবীর প্রতি ৭০ জনের একজন কোনো না কোনো কারণে নিজের ঘর ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে।
একুশ শতকের প্রযুক্তি আমাদের হাতের মুঠোয় পৃথিবী এনে দিয়েছে। কিন্তু সেই পৃথিবীতেই কোটি কোটি মানুষ নিজের বাড়ি থেকে দূরে।
এখানেই জাতিসংঘের সবচেয়ে বড় সংকট—তার নৈতিক ক্ষমতা আছে, কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতা সব সময় যথেষ্ট নয়।
- ট্যাগ:
- মতামত
- শান্তি প্রতিষ্ঠা
- ভূরাজনীতি
- জাতিসংঘ