মা-বাবার অতিরিক্ত শাসন বনাম বিষাক্ত প্যারেন্টিং
“মা ইচ্ছে করে সন্তানের ক্ষতি করবেন—এটা হতে পারে না। মায়ের মতো আপন আসলে পৃথিবীতে কেউ নেই।” এই চিরন্তন সত্যবাক্য দিয়ে ভালোবাসার পরিধি মাপা যায় বটে, কিন্তু নির্মম বাস্তবতা হলো—মাঝেমধ্যে এই মায়াবী সম্পর্কের ছায়াতলেই সন্তান সবচেয়ে বেশি ক্ষতবিক্ষত হয়। কথাটি শুনতে অবাক লাগলেও বহুলাংশে সত্য।
কিছুদিন আগে একজন নামকরা চিকিৎসকের সঙ্গে আমার দীর্ঘ দুই ঘণ্টার একটি ব্যক্তিগত আর্থিক পরিকল্পনা নিয়ে পরামর্শ সেশন ছিল। তিন, পাঁচ ও দশ বছরের আর্থিক লক্ষ্য নির্ধারণের কথা বলতে বলতে আলোচনা একসময় জীবনের গভীরে চলে যায়। আর্থিক পরিকল্পনার সঙ্গে মানুষের মানসিক ও পারিবারিক জীবনের গভীর যোগসূত্র রয়েছে। কথা বলতে বলতে চিকিৎসক একপর্যায়ে খুব ভারী কণ্ঠে বললেন, “আমি এখন আমার স্ত্রীর বাড়িতে বা আলাদা থাকি। আমার মা আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছেন।” শুনলে মনে হতে পারে, সন্তান হয়তো অবাধ্য বা সমাজের চোখে বড় কোনো অপরাধ করেছে। কিন্তু আলোচনার গভীরে উঠে এল এক ভিন্ন ও মর্মান্তিক চিত্র।
চিকিৎসক তাঁর বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে। তাঁর একটি ছোট বোনও রয়েছে। বাবা সরকারি চাকরি করতেন এবং এখন প্রয়াত। পৈতৃক সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার সূত্রে মা, ছেলে ও বোনের অংশ থাকার কথা। কিন্তু চিকিৎসক সবাইকে লিখিত ও মৌখিকভাবে জানিয়ে দিয়েছেন—তিনি সেই সম্পত্তির এক কানাকড়িও নেবেন না। নিজের সম্মান ও মানসিক শান্তি বজায় রাখতে তিনি স্ত্রী-সন্তান নিয়ে চিরতরে সেই ঘর ছেড়ে চলে এসেছেন।
কথা বলতে বলতে তাঁর চোখ-মুখ ছলছল করে উঠল। মায়ের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও সম্মান আজও আছে, কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে আজীবন বয়ে বেড়ানো এক অদৃশ্য কষ্ট। তিনি ছোটবেলার স্মৃতিচারণা করে বললেন, “মায়ের আদর কেমন ছিল, তা আমার মনে পড়ে না। মনে আছে শুধু বকাবকি আর মারধর। স্কুলে ভালো ফল না করলে, ক্লাসে প্রথম বা দ্বিতীয় হতে না পারলে, খেলার মাঠ থেকে মা আমাকে সবার সামনে টেনেহিঁচড়ে এনে পেটাতে শুরু করতেন। গণপরিবহনের বাসের ভেতরেও মারধর করতেন। বাসায় এসে রান্নাঘরের খুন্তি দিয়ে এমনভাবে মেরেছেন যে খুন্তি পর্যন্ত বাঁকা হয়ে গেছে!”
আজ ষাটোর্ধ্ব বয়সেও মায়ের সেই আগ্রাসী মেজাজ বিন্দুমাত্র বদলায়নি। মা কেন এমন করেছিলেন? একটু গভীরে তাকালে বোঝা যায়, মা চেয়েছিলেন সন্তানকে এমন এক শিখরে পৌঁছে দিতে, যেখানে সবাই পৌঁছাতে পারে না। সন্তানের কোনো পরাজয় বা সামান্য ঘাটতিও তিনি মেনে নিতে পারেননি। কিন্তু এই অন্ধ জেদ ও অতিরিক্ত প্রত্যাশার চাপে সন্তানটি তার স্বাভাবিক মানসিক বিকাশের সুযোগ হারিয়েছিল।
আজ তিনি নিজেই একজন প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসক ও বাবা। কিন্তু ছোটবেলার সেই মানসিক আঘাতজনিত হীনম্মন্যতা আজও তাঁর পিছু ছাড়েনি। আজও কোনো বড় সিদ্ধান্ত নিতে গেলে তিনি গভীর দোদুল্যমানতায় ভোগেন—“সিদ্ধান্তটা কি ঠিক হবে, নাকি মা বা অন্য কেউ এটাকে ভুল বলবেন?”
- ট্যাগ:
- মতামত
- মা-বাবা
- শাসন
- বিষাক্ত
- প্যারেন্টিং