বৃহত্তর মুক্তবাণিজ্য জোটে যুক্ত হওয়ার পথে বাংলাদেশ
পত্রিকান্তরে প্রকাশিত এক সংবাদ থেকে জানা গেছে, বাংলাদেশ অল্পদিনের মধ্যেই বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মুক্তবাণিজ্য চুক্তিতে যুক্ত হতে চলেছে। ‘রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ’ (আরসিইপি) জোটে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। বাংলাদেশসহ চারটি দেশকে আরসিইপি চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য একটি ‘অ্যাডহক একসেশন ওয়ার্কিং গ্রুপ’ গঠন করা হয়েছে। ওয়ার্কিং গ্রুপের আনুষ্ঠানিক সুপারিশ পেলেই বাংলাদেশ এ অর্থনৈতিক জোটে অন্তর্ভুক্ত হতে পারবে। বাংলাদেশের পাশাপাশি আরও যে তিনটি দেশ এ গ্রুপের সদস্য হতে যাচ্ছে তারা হচ্ছে-চিলি, শ্রীলংকা ও হংকং। এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও সম্ভাবনাময় একটি অর্থনৈতিক জোট। বাংলাদেশ এ জোটে অন্তর্ভুক্ত হতে পারলে রপ্তানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অপার সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যাবে।
আরসিইপি হচ্ছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল। আসিয়ানভুক্ত ১০টি দেশ ছাড়াও চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড এ জোটে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। আরসিইপি জোটভুক্ত দেশগুলোর মোট জনসংখ্যা ২২০ কোটি, যা বিশ্ব জনসংখ্যার ৩০ শতাংশ। দেশগুলোর সম্মিলিত জিডিপির পরিমাণ ২৯ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। এটি মোট বিশ্ব জিডিপির প্রায় ৩০ শতাংশ। বিশ্ব বাণিজ্যের ২৮ থেকে ৩০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে এ জোটভুক্ত দেশগুলো। আরসিইপিভুক্ত দেশগুলোর বার্ষিক রপ্তানির পরিমাণ ৭ দশমিক ৪৯ ট্রিলিয়ন ডলার, যা বিশ্ব রপ্তানি আয়ের ৩২ দশমিক ৮ শতাংশ। দেশগুলোর বার্ষিক আমদানির পরিমাণ ৫ দশমিক ৫৯ ট্রিলিয়ন ডলার। আরসিইপিভুক্ত দেশগুলোর আন্তঃবাণিজ্যের পরিমাণ ৩৭ শতাংশ। জোটভুক্ত দেশগুলোর ৯০ শতাংশ পণ্য লেনদেনের ওপর থেকে পর্যায়ক্রমে শুল্ক প্রত্যাহার করে নেওয়ার বিধান রয়েছে। উল্লেখ্য, কোনো অর্থনৈতিক জোটের সফলতা বিচার করতে হলে তাদের আন্তঃবাণিজ্যের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে হয়।
বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বৃহৎ বাণিজ্যিক জোট ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। ইইউ গঠিত হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ২৭টি দেশের সমন্বয়ে। এটি এমন একটি আঞ্চলিক সংস্থা, যা সদস্য দেশগুলোর মধ্যে শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা নিশ্চিত করে। পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশের জন্য তারা জেনারালাইজড সিস্টেম অফ প্রেফারেন্সের (জিএসপি) আওতায় শুল্কমুক্ত পণ্য রপ্তানি সুবিধা প্রদান করে। ইইউভুক্ত দেশগুলোর মোট জনসংখ্যা ৪৫ কোটি, যা মোট বিশ্ব জনসংখ্যার ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। উল্লেখ্য, বর্তমানে বিশ্বে যেসব দেশ উন্নত হিসাবে পরিচিত, তাদের জনসংখ্যা থাকে তুলনামূলক কম। আর যেসব দেশের জনসংখ্যা বেশি, সেসব দেশ সাধারণত অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল থাকে। এক্ষেত্রে চীন এক বিস্ময়কর ব্যতিক্রম। চীন জনবহুল দেশ হলেও বিশ্ব অর্থনীতিতে দেশটির অবস্থান দ্বিতীয়। ইইউভুক্ত দেশগুলোর মোট জিডিপির পরিমাণ ১৯ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার। বৈশ্বিক মোট জিডিপির প্রায় ১৫ শতাংশ ধারণ করে ইইউ। আন্তর্জাতিক পণ্য ও সেবা বাণিজ্যর প্রায় ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ ধারণ করে ইইউভুক্ত দেশগুলো। এসব দেশের আন্তঃবাণিজ্য ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ। বিশ্বের আর কোনো অর্থনৈতিক জোটের আন্তঃবাণিজ্যের পরিমাণ এত বেশি নয়। জোটের বাইরের দেশগুলোর সঙ্গে ইইউর বার্ষিক রপ্তানির পরিমাণ ২ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ইউরো। আর আমদানির পরিমাণ ২ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ইউরো। ইউরোপীয় ইউনিয়নকে বিশ্বের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক জোট হিসাবে বিবেচনা করা হয়।
মুক্তবাজার অর্থনীতি চালু হওয়ার পর বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে একাধিক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য জোট গড়ে উঠেছে। কিন্তু বাংলাদেশ এর কোনো জোটেই সত্যিকারভাবে যুক্ত হতে পারেনি। বাংলাদেশের উদ্যোগে ১৯৮৫ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত দক্ষিণ এশিয়ার ৭টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকারপ্রধানদের শীর্ষ বৈঠকে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) গঠিত হয়। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এই আঞ্চলিক জোট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি শাহাদতবরণ করলে সার্ক গঠন কার্যক্রম স্তিমিত হয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রপতি এইচএম এরশাদের আমলে ঢাকায় অনুষ্ঠিত দক্ষিণ এশিয়ার ৭টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের উপস্থিতিতে সার্ক গঠিত হয়। এই ৭টি দেশ হচ্ছে-বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, মালদ্বীপ, নেপাল, ভুটান ও শ্রীলংকা। পরে আফগানিস্তান এ জোটের অন্তর্ভুক্ত হয়। সার্ক গঠনের উদ্দেশ্য ছিল এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে বিরাজমান সমস্যা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য সাউথ এশিয়ান প্রেফারেন্সিয়াল ট্রেড এগ্রিমেন্ট (সাপটা) স্বাক্ষর করা হয়। কিন্তু নানা কারণে সাপটা উল্লেখযোগ্য কোনো সফলতা অর্জন করতে পারেনি।
সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক খুব একটা ভালো নয়। ফলে সাপটা প্রত্যাশিত মাত্রায় সুফল দিতে পারছে না। বরং সাপটার কার্যক্রম বর্তমানে অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছে। অথচ সার্ক ও সাপটার উজ্জ্বল সম্ভাবনা ছিল। সার্কভুক্ত দেশগুলোর মোট আয়তন ৫১ দশমিক ২ লাখ বর্গকিলোমিটার। এটা বিশ্বের মোট স্থলভাগের ৩ শতাংশ। মোট জনসংখ্যা ২০৬ কোটি। সার্ক জনসংখ্যা বিশ্ব জনসংখ্যার ২৫ শতাংশ। সার্ক দেশগুলোর মোট বাণিজ্যের পরিমাণ ১ দশমিক ৩৩৫ ট্রিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে রপ্তানির পরিমাণ ৪৬২ বিলিয়ন ডলার এবং আমদানির পরিমাণ ৮৭৩ বিলিয়ন ডলার। কোনো আঞ্চলিক জোট সফল হওয়ার অন্যতম নির্দেশক হচ্ছে তাদের আন্তঃবাণিজ্য; কিন্তু সার্ক দেশগুলো আন্তঃবাণিজ্যের ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে। সার্ক দেশগুলোর আন্তঃবাণিজ্যের পরিমাণ মাত্র ৫০ বিলিয়ন ডলার, যা দেশগুলোর মোট আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাত্র ৫ শতাংশ। বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সার্কের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে আমরা কাজে লাগাতে পারছি না। এ মুহূর্তে সংস্থাটির চাঙা হওয়ার তেমন কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। তাই বাংলাদেশকে এখন জরুরি ভিত্তিতে বিশ্বের বিভিন্ন আঞ্চলিক অর্থনৈতিক জোটে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা চালাতে হবে। বাংলাদেশ আরসিইপি জোটে যুক্ত হতে যাচ্ছে, এটা খুবই আনন্দের বিষয়। এই প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- জোট
- মুক্তবাণিজ্য