দুর্গোৎসবের এ আনন্দ যেন সব সময় বিরাজ করে

www.ajkerpatrika.com মাসুদ উর রহমান প্রকাশিত: ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৫২

২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব। এবারের পূজামণ্ডপের আনন্দ, ঢাকের বাদ্য, আলোকসজ্জা, আরতি, সাংস্কৃতিক আয়োজন এবং প্রতিমা বিসর্জনের নানা মুহূর্তের ভিডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নিউজফিডে ঘুরেফিরে আসছে। উৎসবের এসব দৃশ্য কেবল একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের আনন্দের চিত্র নয়; বরং বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সমাজের সৌন্দর্য ও পারস্পরিক সম্প্রীতিরও প্রতিচ্ছবি। এবারের দুর্গোৎসবের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, পূজাকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। উৎসবমুখর পরিবেশে পূজা উদ্‌যাপনের এই চিত্র নিঃসন্দেহে স্বস্তিদায়ক। একই সঙ্গে এটি আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও হাজির করে—এমন নিরাপদ ও আনন্দমুখর পরিবেশ কি কেবল উৎসবের কয়েকটি দিনের জন্য, নাকি বাংলাদেশের সব নাগরিকের সারা বছরের অধিকার?


একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ধর্মীয় উৎসব নির্বিঘ্নে উদ্‌যাপনের পরিবেশ নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম দায়িত্ব। সেই বিবেচনায় এবারের দুর্গোৎসবে নিরাপত্তা ও সম্প্রীতি বজায় রাখার ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। বিশেষত ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ যখন বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে, তখন উৎসবের দিনগুলোতে স্বস্তি ও আনন্দের পরিবেশ তৈরি হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই সাফল্যকে স্থায়ী করতে হলে উৎসবকেন্দ্রিক নিরাপত্তার পাশাপাশি ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জানমাল, উপাসনালয়, সম্পত্তি ও নাগরিক অধিকার রক্ষায় সারা বছর কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।

রাজনৈতিক বাস্তবতার দিক থেকেও এবারের দুর্গোৎসবের তাৎপর্য রয়েছে। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ নির্বাচনে বিএনপির ক্ষমতায় আসার পর হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশের রাজনৈতিক অবস্থান ও প্রত্যাশা নিয়ে নানা আলোচনা হয়েছে। নির্বাচনে হিন্দু ভোটারদের ভোটের সুনির্দিষ্ট হিসাব বা তাঁদের সামগ্রিক রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে অতিরঞ্জিত দাবি না করেও বলা যায়, একটি অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে নাগরিকেরা যে দলকেই সমর্থন করুন না কেন, নির্বাচিত সরকারের কাছে তাঁদের প্রত্যাশা থাকে নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সমান অধিকার। সেই প্রত্যাশা পূরণ করা সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছার পাশাপাশি গণতান্ত্রিক দায়িত্বেরও অংশ। দুর্গোৎসবের আনন্দমুখর পরিবেশ তাই সরকারের জন্য ইতিবাচক অর্জন; একই সঙ্গে এটি ভবিষ্যতে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার প্রেরণা।

এবারের দুর্গোৎসবে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে চোখে পড়েছে। বিভিন্ন পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিদের অনেকে অসাম্প্রদায়িক বক্তব্য দেওয়ার পাশাপাশি সশরীর পূজামণ্ডপে উপস্থিত হয়েছেন, পূজারিদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেছেন এবং তাঁদের আনন্দে অংশ নিয়েছেন। মুসলিম সম্প্রদায়ের বহু তরুণ-তরুণীর স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিও ছিল লক্ষণীয়। এই উপস্থিতি নিছক সৌজন্য বিনিময় নয়; এর মধ্যে রয়েছে পারস্পরিক আস্থা ও সামাজিক সংহতির বার্তা। অন্যের ধর্মীয় উৎসবে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে মানুষ যখন ধর্মীয় পরিচয়ের সীমা অতিক্রম করে মানবিক সম্পর্ককে গুরুত্ব দেয়, তখনই সমাজের প্রকৃত শক্তি প্রকাশিত হয়।


‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’—বহুল প্রচলিত এই বাক্য এবারের দুর্গোৎসবে নতুন করে তাৎপর্য পেয়েছে। তবে বাক্যটির মর্মার্থ শুধু অন্য ধর্মের উৎসবে যোগ দেওয়া কিংবা শুভেচ্ছা জানানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর অন্তর্নিহিত দর্শন হলো, ধর্মবিশ্বাস ব্যক্তির নিজস্ব বিষয় হলেও উৎসবের আনন্দ, মানবিকতা ও সামাজিক সম্প্রীতি সবার জন্য উন্মুক্ত। মুসলমান সম্প্রদায়ের ঈদে যেমন অন্য ধর্মাবলম্বী মানুষের উপস্থিতির সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় আনন্দ বাড়িয়ে দিতে পারে, তেমনি হিন্দু সম্প্রদায়ের দুর্গাপূজায় অন্য সম্প্রদায়ের মানুষের উপস্থিতিও উৎসবকে আরও সর্বজনীন করে তোলে। ধর্মীয় পরিচয় মানুষের মধ্যে ভিন্নতা সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু সেই ভিন্নতা যেন বৈরিতার কারণ না হয়—এই বোধ একটি সভ্য ও মানবিক সমাজের ভিত্তি।


তবে সম্প্রীতির এই চিত্রের বিপরীতে আমাদের সমাজের আরেকটি বাস্তবতা ভুলে গেলে চলবে না। ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়ানো, অন্য সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে উসকানি দেওয়া কিংবা সামাজিক অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা এ দেশে নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে ধর্মীয় সমাবেশ ও প্রচারের মঞ্চকে ব্যবহার করে কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বিভাজনমূলক বক্তব্য দিয়ে থাকে। ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাকে পুঁজি করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের এই প্রবণতা সমাজের জন্য বিপজ্জনক। ধর্ম মানুষের নৈতিক উন্নতি, আত্মশুদ্ধি, মানবিকতা ও কল্যাণের পথ দেখানোর কথা। অথচ সেই ধর্মের নামেই যখন ঘৃণা, বিদ্বেষ ও অসহিষ্ণুতার চর্চা হয়, তখন ধর্মের মৌলিক শিক্ষাকেই প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়।
এবার পূজার সময়ে ওয়াজ-মাহফিল আয়োজনের অনুমতি না দেওয়ার বিষয়টি নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে মূল বিবেচনা হওয়া উচিত জননিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা এবং উৎসবের স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখা। কোনো ধর্মীয় আয়োজনের ওপর নির্বিচার নিষেধাজ্ঞা নয়; বরং সব ধর্মের মানুষের জন্য সমান নীতি, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ এবং উসকানিমূলক বক্তব্যের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের আদর্শ। ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সামাজিক নিরাপত্তা পরস্পরের প্রতিপক্ষ নয়; দায়িত্বশীল রাষ্ট্রব্যবস্থায় এ দুটিকে সমন্বিতভাবেই নিশ্চিত করতে হয়।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও