চট্টগ্রাম বন্দর: ইজারার চুক্তি সংসদে আলোচিত হলো না কেন

প্রথম আলো এম এম খালেকুজ্জামান প্রকাশিত: ২২ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৫৮

‘রিসোর্স কার্স’ বা সম্পদের অভিশাপ হলো এমন একটি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি, যেখানে প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ (যেমন তেল, গ্যাস, সোনা বা হীরা) থাকা সত্ত্বেও কোনো দেশ কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জন করতে পারে না; বরং অর্থনৈতিক মন্দা, অস্থিতিশীলতা ও দুর্নীতির শিকার হয়। একে অনেক সময় ‘প্যারাডক্স অব প্লেন্টি’ বা প্রাচুর্যের প্যারাডক্স বলা হয়। চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে বাংলাদেশ কি এমন প্যারাডক্সের শিকার?


একটি বন্দরের গভীরতা মাপা হয় তার নাব্যতায়, কিন্তু রাষ্ট্রের গভীরতা বোঝা যায় তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতায়। চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ১৫ বছরের জন্য বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার প্রশ্নটি কেবল তাই দক্ষতা, বিনিয়োগ কিংবা মুনাফার নয়; প্রশ্নটি রাষ্ট্রীয় সম্পদের ওপর জনগণের অধিকার এবং সেই সম্পদ নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে গণতান্ত্রিক জবাবদিহিরও।


সম্প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরাতের কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনা নিয়ে চুক্তি হয়েছে। কিন্তু এত বড় একটি জাতীয় অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত সংসদে আলোচনা হলো না কেন? চুক্তির শর্ত, রাষ্ট্রের আর্থিক লাভ-ক্ষতি, বন্দরের শত শত শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নগুলো নিয়ে সংসদে অর্থবহ বিতর্কের প্রয়োজন বোধ করা হলো না কেন?


এই প্রশ্ন বিদেশি বিনিয়োগের বিরোধিতা থেকে নয়; বরং বিনিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে গণতান্ত্রিক জবাবদিহির দাবি থেকেই উঠছে। চুক্তি আইনগতভাবে বৈধ হতে পারে, কিন্তু তাই বলে তার প্রতিটি সিদ্ধান্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে জনস্বার্থের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে যায় না। বিশেষত যে সিদ্ধান্তের প্রভাব বর্তমান সরকারের মেয়াদ ছাড়িয়ে পরবর্তী দেড় দশক পর্যন্ত বিস্তৃত হবে, সে ক্ষেত্রে সংসদে আলোচনা কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়—এটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের অংশ।


বন্দর আধুনিকায়ন চাই, কিন্তু কী শর্তে


চট্টগ্রাম বন্দরের দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। জাহাজের অপেক্ষা, কনটেইনার খালাসে বিলম্ব, কাস্টমসের দীর্ঘসূত্রতা এবং সড়ক-রেল যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা আমদানি-রপ্তানির ব্যয় বাড়ায়। আন্তর্জাতিক অপারেটরের প্রযুক্তি, অভিজ্ঞতা ও পেশাদার ব্যবস্থাপনা এসব সমস্যার কিছু সমাধান করতে পারে। বিদেশি প্রতিষ্ঠান মানেই জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী—এমন সরল সিদ্ধান্ত গ্রহণেরও কারণ নেই। কিন্তু বিদেশি অপারেটর নিয়োগের পক্ষে যুক্তি থাকলেই নির্দিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানকে নির্দিষ্ট শর্তে দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রশ্নের ঊর্ধ্বে উঠে যায় না। বরং বিনিয়োগের প্রয়োজন যত বেশি, চুক্তির স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতার গুরুত্বও তত বেশি।


সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এনসিটি পরিচালনা ও আধুনিকায়নে ডিপি ওয়ার্ল্ডের ১৫ কোটি ডলার বিনিয়োগ করার কথা। এর মধ্যে পাঁচ কোটি ডলার এককালীন অর্থ হিসেবে বন্দর কর্তৃপক্ষকে দেওয়ার কথা রয়েছে। চুক্তির মেয়াদ ১৫ বছর। রাজস্ব ভাগাভাগির ব্যবস্থায় বন্দর কর্তৃপক্ষ কনটেইনারপ্রতি আয়ের ৪০ থেকে ৬৭ শতাংশ পেতে পারে বলে জানানো হয়েছে; এর বাইরে বার্ষিক নির্ধারিত ফি পাওয়ার কথাও প্রকাশিত হয়েছে।


এসব তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এগুলোই পুরো চুক্তির মূল্যায়নের জন্য যথেষ্ট নয়। বিনিয়োগের অর্থের পাশাপাশি জানতে হবে, টার্মিনালটির বর্তমান আয় ও ব্যয় কত, নতুন ব্যবস্থায় নিট আয় কীভাবে নির্ধারিত হবে, পরিচালন ব্যয় কে বহন করবে, মাশুল পরিবর্তনের ক্ষমতা কার হাতে থাকবে এবং চুক্তির মেয়াদ শেষে সম্পদ ও প্রযুক্তি কী অবস্থায় রাষ্ট্রের কাছে ফিরে আসবে।


সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, এনসিটি এমন একটি সচল টার্মিনাল, যেখানে ইতিমধ্যে বিপুল সরকারি বিনিয়োগ রয়েছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নির্মাণ ও যন্ত্রপাতি স্থাপনসহ এতে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ২ হাজার ৭১২ কোটি টাকা। গত অর্থবছরে এখানে ১৩ লাখ ৮৫ হাজার একক কনটেইনার ওঠানো-নামানো হয়েছে। তাহলে এই বিদ্যমান সক্ষমতার আর্থিক মূল্যায়ন কীভাবে করা হয়েছে? দেশীয় ব্যবস্থাপনায় পরিচালনা অব্যাহত রাখার বিকল্পটি কি সমান গুরুত্ব দিয়ে যাচাই করা হয়েছিল? রাষ্ট্রকে শুধু সম্ভাব্য আয় দেখলেই চলবে না; বিকল্প ব্যবস্থায় কত আয় হতে পারত, সেটিও হিসাব করতে হবে।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও