বিশ্ববিদ্যালয় কি শুধু নামেই, নাকি শিক্ষক ও গবেষণাতেও?
বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে, বেড়েছে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের সংখ্যাও। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে—আমরা কি সত্যিকার অর্থে বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলছি, নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম দিয়ে উচ্চশিক্ষার সনদ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান তৈরি করছি? একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত পরিচয় তার ভবনের উচ্চতা, ক্যাম্পাসের আয়তন কিংবা শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিয়ে নির্ধারিত হয় না। নির্ধারিত হয় তার শিক্ষকদের একাডেমিক যোগ্যতা, গবেষণার মান, নতুন জ্ঞান সৃষ্টির সক্ষমতা এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়নে অবদান দিয়ে।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নীতিগত অগ্রাধিকারে এই মৌলিক বিষয়গুলো এখনো যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না।
সাম্প্রতিক সময়ে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা আমাদের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে শিক্ষা ছুটি নিয়ে গেলেও নির্ধারিত সময় শেষে কর্মস্থলে ফিরে আসছেন না। তাঁদের কেউ কেউ ছুটিকালীন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাওয়া বেতন-ভাতা এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধাও ফেরত দিচ্ছেন না।
ফলে রাষ্ট্র ও বিশ্ববিদ্যালয়কে একই সঙ্গে দুটি ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। প্রথমত, যে শিক্ষক উচ্চতর প্রশিক্ষণ ও গবেষণার অভিজ্ঞতা অর্জন করে দেশে ফিরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণাকে সমৃদ্ধ করার কথা, বিশ্ববিদ্যালয় তাঁর সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, সীমিত সরকারি অর্থ থেকে তাঁর পেছনে যে ব্যয় করা হয়েছে, সেটিও অনেক ক্ষেত্রে পুনরুদ্ধার করা যাচ্ছে না।
এটি বিচ্ছিন্ন কোনো সমস্যা নয়। ২০২৬ সালের জুলাই মাসে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২ জন শিক্ষক শিক্ষা ছুটি শেষে কর্মস্থলে যোগ দেননি। তাঁদের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের বকেয়া পাওনা ছিল প্রায় ৪ কোটি ৮ লাখ টাকা। একই মাসে প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদনে জানা যায়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৮ জন শিক্ষক নির্ধারিত সময় শেষে ফিরে না আসায় তাঁদের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাওনা ৯ কোটি টাকার বেশি। এসব ঘটনা শুধু আর্থিক অনিয়মের প্রশ্ন নয়, মেধা ধরে রাখার নীতির দুর্বলতাকেও প্রকাশ করে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, একজন শিক্ষক বিদেশে পিএইচডি সম্পন্ন করার পর কেন দেশে ফিরতে চাইবেন না? সবাই যে একই কারণে ফেরেন না, তা নিশ্চয়ই নয়। কারও ব্যক্তিগত বা পারিবারিক বাস্তবতা থাকতে পারে। তবে বড় একটি নীতিগত প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বিদেশে একজন গবেষক যে পেশাগত মর্যাদা, গবেষণার পরিবেশ, আর্থিক নিরাপত্তা ও কর্মজীবন গঠনের সুযোগ পান, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি তার ধারেকাছেও আছে?
আমাদের নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে, আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে মেধাবী গবেষকদের চাহিদা রয়েছে। উচ্চদক্ষ মানবসম্পদকে শুধু দেশপ্রেমের আহ্বান জানিয়ে ধরে রাখা সম্ভব নয়। তাঁদের এমন একটি পেশাগত পরিবেশ দিতে হবে, যেখানে দেশে ফিরে আসা কেবল নৈতিক দায়িত্ব নয়, একটি সম্মানজনক ও আকর্ষণীয় কর্মজীবনের সিদ্ধান্তও হয়ে ওঠে। চীন এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। দেশটি গবেষণায় বিপুল বিনিয়োগ, প্রতিযোগিতামূলক পারিশ্রমিক, উন্নত গবেষণাগার এবং বিশেষায়িত গবেষণা কর্মসূচির মাধ্যমে দেশীয় ও বিদেশি গবেষকদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে। একইভাবে, দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে গবেষকেরা যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কাজ করতে গেছেন উন্নত গবেষণা অবকাঠামো, অর্থায়ন এবং পেশাগত সুযোগের কারণে। বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক মানের সব সুবিধা রাতারাতি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। কিন্তু মেধাবী শিক্ষক ও গবেষকদের ধরে রাখার জন্য একটি বাস্তবসম্মত, প্রতিযোগিতামূলক এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতি গ্রহণ করা অবশ্যই সম্ভব।
- ট্যাগ:
- মতামত
- বিশ্ববিদ্যালয়
- গবেষণা
- শিক্ষক