জুলাই অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনীতি ও সমাজে বেশকিছু পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়েছে। ইসলামি রাজনীতি, ধর্মীয় পরিচয় এবং মুসলমানের সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তি নিয়ে নতুন করে আলোচনা হচ্ছে। কেউ এ পরিবর্তনকে ইসলামি রাজনীতির উত্থান হিসাবে দেখছেন, কেউ দেখছেন দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হিসাবে। কিন্তু এ বিতর্কে একটি প্রশ্ন তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত : রাজনীতির দৃশ্যমান পরিবর্তনের সঙ্গে বাংলাদেশের ইতিহাসের বয়ানও কি বদলেছে?
রাজনীতিতে কোন দল ক্ষমতায় আছে, কোন মতাদর্শের ভাষা বেশি শোনা যাচ্ছে, আর জাতির ইতিহাস ও পরিচয়ের অর্থ নির্ধারণের ক্ষমতা কার হাতে-এগুলো আলাদা বিষয়। রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটতে পারে, নতুন দল ও নতুন রাজনৈতিক ভাষা সামনে আসতে পারে; কিন্তু একই সঙ্গে জাতীয় ইতিহাসের প্রচলিত কাঠামোও অক্ষত থাকতে পারে। জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশকে বোঝার জন্য এ পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয় নির্মাণে ভাষা, সাহিত্য, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের নানা প্রতীক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এসবের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই। প্রশ্নটি অন্য জায়গায় : এ জাতীয় পরিচয়ের বয়ানে বাঙালি মুসলমানের নিজস্ব ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা কতটা জায়গা পেয়েছে? তাদের ইতিহাস কি বৃহত্তর বাঙালি ইতিহাসের একটি অংশ হিসাবেই স্বীকৃতি পায়, নাকি তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক চিন্তা, ধর্মীয় সংস্কার এবং সামাজিক সংগ্রামও বাংলাদেশের ইতিহাস নির্মাণকারী শক্তি হিসাবে বিবেচিত হয়?
এ প্রশ্ন বোঝার জন্য জাতীয় স্মৃতির দিকে তাকানো যেতে পারে।
প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার বাংলাদেশের ইতিহাসে পরিচিত এক বিপ্লবী নারী। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে তার সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ স্মরণ করার যথেষ্ট কারণ আছে। তাকে স্মরণ করা নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলা অবান্তর; কিন্তু বাংলার ইতিহাসে আরও অনেকে বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে সংগঠিত করেছেন, সামাজিক সম্পর্ক বদলানোর চেষ্টা করেছেন এবং ক্ষমতাশালী শ্রেণির বিরুদ্ধে শোষিত জনতার পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। তাদের স্মৃতি জাতীয় পরিসরে কতটা জায়গা পেয়েছে, সেই প্রশ্নও তোলা দরকার।
দুদু মিয়ার কথা ধরা যাক। উনিশ শতকে ফরায়েজি আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা দুদু মিয়ার প্রকৃত নাম মুহসিনউদ্দিন আহমদ। তার পিতা হাজি শরীয়তুল্লাহর সূচনা করা আন্দোলনের নেতৃত্ব তিনি গ্রহণ করেন ১৮৪০ সালে। ফরায়েজি আন্দোলন ধর্মীয় সংস্কারের মধ্য দিয়ে শুরু হলেও দুদু মিয়ার নেতৃত্বে তা বাংলার কৃষক সমাজের সংগঠন এবং জমিদারি নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের সঙ্গেও যুক্ত হয়।
দুদু মিয়ার ইতিহাস তাই শুধু ধর্মীয় সংস্কারের ইতিহাস নয়। এটি বাংলার কৃষকসমাজ, ঔপনিবেশিক শাসন এবং গ্রামীণ ক্ষমতার সম্পর্কের ইতিহাসও। বাংলার মুসলমানদের ধর্মীয় পরিচয় কীভাবে সামাজিক সংগঠন ও রাজনৈতিক প্রতিরোধের ভাষার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল, ফরায়েজি আন্দোলন তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
দুদু মিয়া বাংলাদেশের ইতিহাসে একেবারে অনুপস্থিত নন। তার সম্পর্কে গবেষণা হয়েছে, ইতিহাসের বইয়েও তার উল্লেখ রয়েছে; কিন্তু সাধারণ মানুষের জাতীয় স্মৃতি, জনপরিসরের স্মারক এবং রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক স্বীকৃতিতে তার অবস্থান কতটা দৃশ্যমান?
এখানে তুলনাটি প্রীতিলতার স্বীকৃতিকে প্রশ্ন করার জন্য নয়; দুদু মিয়ার মতো ব্যক্তিত্বের স্বীকৃতি কেন একই মাত্রায় বিস্তৃত হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার জন্য। দুজনের রাজনৈতিক প্রকল্প এক ছিল না; কিন্তু জাতীয় ইতিহাসে কার অবদান কোন ভাষায় স্বীকৃতি পায়, কোন সংগ্রামকে জাতীয় মুক্তির ইতিহাসের অংশ হিসাবে দেখা হয়, আর কোন সংগ্রামকে সীমিত ধর্মীয় বা সামাজিক পরিসরে আটকে রাখা হয়-এসবই প্রশ্ন বোঝার জন্য এ তুলনাটা গুরুত্বপূর্ণ।
দুদু মিয়ার মতো ব্যক্তিত্বের ইতিহাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বাংলার মুসলমান কেবল একটি ধর্মীয় জনগোষ্ঠী ছিলেন না। তারা ছিলেন কৃষক, সংগঠক, সংস্কারক এবং রাজনৈতিক আন্দোলনের নির্মাতা। তাদের ইতিহাসকে প্রান্তিক করে রাখলে বাংলার সামাজিক ইতিহাসও অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বাঙালি মুসলমানের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা তখন হয় বৃহত্তর বাঙালি পরিচয়ের মধ্যে মিশে যায়, নয়তো তাকে আলাদা করে কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের আলোকে ব্যাখ্যা করা হয়। দুই ক্ষেত্রেই তাদের নিজস্ব ঐতিহাসিক ভূমিকা বোঝার সুযোগ সংকুচিত হয়।