একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীকে যদি প্রশ্ন করা হয়, ‘আপনি কী পড়ছেন?’, তিনি হয়তো বেশ সাবলীলভাবেই তার অধ্যয়নরত বিষয়ের নাম বলে দেবেন। যদি প্রশ্ন করা হয়, ‘কেন পড়ছেন?’, তবে বেশির ভাগ উত্তর আসবে, ‘একটি ভালো চাকরির প্রত্যাশায়’ কিন্তু যদি তাকে আরও গভীরে গিয়ে জিজ্ঞেস করা হয়, ‘এই উচ্চশিক্ষা আপনাকে কেমন মানুষ বা কতটা দক্ষ নাগরিক হিসাবে গড়ে তুলছে’ তখন উত্তরটি হয়তো আর অত সহজে বা তাৎক্ষণিকভাবে আসবে না। অথচ যে কোনো দেশের উচ্চশিক্ষার প্রকৃত সাফল্য ও সার্থকতা লুকিয়ে থাকে এই শেষ প্রশ্নটির মুখোমুখি দাঁড়ানোর ভেতরেই।
আজকের বাংলাদেশে কতগুলো নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলো, সেখানে কত লাখ তরুণ ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেল কিংবা বছর শেষে কত হাজার শিক্ষার্থীকে ডিগ্রি তুলে দেওয়া হলো, এগুলো নিঃসন্দেহে একটি রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক প্রসারের ইতিবাচক পরিসংখ্যান। তবে কেবল এ সংখ্যাই শিক্ষার চূড়ান্ত লক্ষ্য হতে পারে না। শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষ থেকে বাস্তবে কী শিখছেন, তার অর্জিত জ্ঞান সামাজিক ও বৈশ্বিক সমস্যা সমাধানে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখছে এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে তিনি নিজেকে কতটা উপযোগী করে তুলছেন, সেটিই আজ আমাদের উচ্চশিক্ষার সবচেয়ে বড় মৌলিক প্রশ্ন।
সংখ্যার বিস্তার বনাম গুণগত রূপান্তর : বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বর্তমানে দেশে ৬১টি সরকারি, ১১৭টি বেসরকারি ও ৩টি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হচ্ছে। এর পাশাপাশি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোতেও লাখ লাখ তরুণ উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন। বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষার প্রাঙ্গণে আগমন নিঃসন্দেহে দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও সামাজিক সচেতনতার এক উজ্জ্বল ছবি তুলে ধরে। কিন্তু এ অভাবনীয় প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে এক অস্বস্তিকর ও গভীর বাস্তবতা আমাদের সামনে প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে : উচ্চশিক্ষার সুযোগ যেভাবে জ্যামিতিক হারে প্রসারিত হয়েছে, শিক্ষার মান কি সেই অনুপাতে বাড়ানো সম্ভব হয়েছে?
আমাদের কাছে কি কোনো সুনির্দিষ্ট জাতীয় পরিসংখ্যান আছে, কোন বিষয়ে ঠিক কতজন শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন এবং তাদের কর্মসংস্থানের বাস্তব সম্ভাবনা কতটুকু? দেশের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত চাহিদার তোয়াক্কা না করে অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তি করানো হচ্ছে। কিন্তু আমরা কি তাদের বিশ্বমানের দক্ষতা ও স্বনির্ভর চিন্তা নিশ্চিত করতে পারছি? দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয় কি শিক্ষার্থীদের জন্য গবেষণা ও জ্ঞানচর্চার সমান অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছে?
আমরা এখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) এক যুগান্তকারী সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। এই নতুন বাস্তবতায় প্রচলিত বহু কর্মসংস্থানের ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আজ যে দক্ষতাটির অত্যন্ত উচ্চ চাহিদা রয়েছে, আগামী পাঁচ বা দশ বছর পর সেটি হয়তো এআই বা স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। এমন এক অনিশ্চিত ও পরিবর্তনশীল কর্মক্ষেত্রে কেবল তথাকথিত মুখস্থবিদ্যা আর সিজিপিএ দিয়ে টিকে থাকা অসম্ভব। তাই উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থীকে এমন এক জীবনমুখী ও প্রায়োগিক শিক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হবে, যা তাকে কেবল তথ্যের নিষ্ক্রিয় ধারণকারী হিসাবে নয়; বরং জটিল সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধানকারী, নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে দ্রুত খাপ খাইয়ে নেওয়া এবং স্বাধীন চিন্তাশীল ব্যক্তিত্ব হিসাবে গড়ে তুলবে।