অস্বীকার, প্রতিহিংসা ও ঘৃণার সংস্কৃতি
‘রিকনসিলিয়েশন’ শব্দটির বাংলা অর্থ হলো মিলমিশ, সমঝোতা বা মীমাংসা। প্রসঙ্গভেদে এর ব্যবহার ভিন্ন হতে পারে। ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে মিলন বা পুনর্মিলন; সামাজিক বা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বিরোধ মীমাংসা বা সমঝোতা।
রিকনসিলিয়েশনের আরেকটি রূপ হলো ‘ডিডিআর’ (ডিজআর্মামেন্ট, ডিমোবিলাইজেশন, রিইন্টিগ্রেশন)। একটি গৃহযুদ্ধের সময় সমাজ ভাগ ভাগ হয়ে থাকে। যুদ্ধে এক পক্ষ জেতে, আরেক পক্ষ হারে। যুদ্ধ একসময় থামে। কিন্তু যুযুধান দুই পক্ষের মধ্যকার এই যুদ্ধ যেন শেষ হয়েও শেষ হয় না। যুদ্ধ গড়ায় রাজনীতিতে, রাষ্ট্রের মালিকানা নিয়ে ক্ষমতার কামড়াকামড়িতে। এই বিভাজন কিয়ামত পর্যন্ত জারি রাখার মতো নির্বুদ্ধিতা নিতান্ত উন্মাদ না হলে আজকের যুগে কেউ প্রশ্রয় দেবে না। দরকার হয় ডিডিআর।
কসোভোতে ডিডিআর প্রক্রিয়া ছিল এক জটিল অথচ ঐতিহাসিক প্রয়াস, যেখানে যুদ্ধ শেষে অস্ত্র নামিয়ে নতুন সমাজ গঠনের পথ বেছে নেওয়া হয়েছিল। এটি আংশিকভাবে সফল হয়েছিল। হাজারো যোদ্ধা অস্ত্র সমর্পণ করলেও অনেক অস্ত্র গোপন রয়ে যায়; তবু সাবেক যোদ্ধাদের নতুন প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়েছিল। সেখানে বাংলাদেশের একদল ‘শান্তিরক্ষী’র ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৯৯ সালের জুনে কুমানোভা চুক্তি ও জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ১২৪৪ নম্বর প্রস্তাবের মাধ্যমে কসোভোতে ডিডিআর প্রক্রিয়া শুরু হয়। কসোভোর পাহাড়ি উপত্যকায় যুদ্ধের ধোঁয়া যখন মিলিয়ে গেল, তখন মানুষের হাতে রইল ভাঙা ঘর, শূন্য মাঠ আর অগণিত ক্ষত। সেই ক্ষতের ওপর দাঁড়িয়ে শুরু হলো ডিডিআর প্রক্রিয়া, যেন ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে নতুন জীবনের বীজ রোপণ। তবু সবকিছু নিখুঁত হয়নি। অনেক অস্ত্র গোপন থাকে, অনেক ক্ষত অমলিন থেকে যায়। কিন্তু এই প্রক্রিয়া দেখায় শান্তি কেবল অস্ত্র ফেলে দেওয়ার নাম নয়, বরং নতুন পরিচয়ে সমাজে ফিরে আসার নাম।
এর ফলে পরবর্তী সময়ে গৃহযুদ্ধ এড়ানো সম্ভব হয়। সাবেক যোদ্ধাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত করা যায়। আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় একটি নতুন নিরাপত্তাকাঠামো গড়ে ওঠে। তারপরও অস্ত্র পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি।
প্রক্রিয়াটি অনেকাংশে আন্তর্জাতিক চাপের ফল ছিল, স্থানীয় সমাজের অংশগ্রহণ সীমিত ছিল। অর্থনৈতিক পুনঃঅন্তর্ভুক্তি সব সময় সফল হয়নি। কসোভোর ডিডিআর প্রক্রিয়া ছিল এক আংশিক বিজয়, যেখানে যুদ্ধের আগুন থেকে শান্তির অঙ্কুরোদ্গম ঘটেছিল। এটি আমাদের শেখায় অস্ত্র নামানোই যথেষ্ট নয়; প্রকৃত শান্তি আসে তখনই, যখন সাবেক যোদ্ধারা সমাজের অংশ হয়ে ওঠে, আর ক্ষতবিক্ষত মানুষেরা নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখতে শেখে।
আমরা ইতিহাসের এ রকম একটা পর্ব পেরিয়ে এসেছি ১৯৭১ সালে। একাত্তরের বিভাজনকে আমাদের রাজনীতিবিদ আর বুদ্ধিজীবীরা চিরস্থায়ী রূপ দিয়েছেন। ডিডিআরের চিন্তা কারও মাথায় আসেনি। সমাজটাকে বিভক্ত রাখতে পারলে গোষ্ঠীগত রাজনীতি করতে অনেক সুবিধা।
আমাদের সামনে আরেকটি উদাহরণ হলো দক্ষিণ আফ্রিকা। এর ইতিহাস যেন এক দীর্ঘ রাতের কাহিনি, যেখানে মানুষের চামড়ার রং হয়ে উঠেছিল ভাগ্য নির্ধারণের নির্মম মানদণ্ড। শ্বেতাঙ্গ শাসকগোষ্ঠী তৈরি করেছিল এক অদৃশ্য দেয়াল, যার নাম ছিল অ্যাপারথাইড (বর্ণবাদ)। সেই দেয়ালের ওপারে ছিল অগণিত কালো মানুষের জীবন, যেখানে স্বাধীনতার আলো পৌঁছাত না, যেখানে মানবাধিকারের গান স্তব্ধ হয়ে যেত বন্দুকের গর্জনে। দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে অন্ধকার ছায়া ফেলেছিল দশকের পর দশক। রাষ্ট্রের আইন হয়ে উঠেছিল বৈষম্যের রক্ষাকবচ।
কিন্তু অন্ধকারের গর্ভেই জন্ম নেয় আলোর আকাঙ্ক্ষা। নেলসন ম্যান্ডেলা ও তাঁর সহযোদ্ধারা সেই আকাঙ্ক্ষাকে রূপ দিয়েছিলেন সংগ্রামে। কারাগারের শিকল ভেদ করে তাঁদের কণ্ঠস্বর পৌঁছে গিয়েছিল মানুষের হৃদয়ে। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রতিটি গ্রামে, প্রতিটি শহরে, প্রতিটি নিশ্বাসে তখন প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল মুক্তির ডাক। তাঁদের এই ভূমিকা আমাদের নিয়ে যায় সেই মুহূর্তে, যখন বর্ণবাদী শাসনের অবসান ঘটে, আর সূচনা হয় রিকনসিলিয়েশন প্রক্রিয়ার। এটি কেবল রাজনৈতিক পরিবর্তন ছিল না, বরং ছিল মানবিক পুনর্জন্মের এক মহাযাত্রা।
- ট্যাগ:
- মতামত
- সংস্কৃতি
- ঘৃণা
- প্রতিহিংসা