গঙ্গা চুক্তি নবায়নের বদলে নতুন করে স্বাক্ষরের চিন্তা আত্মঘাতী
৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে এ বছরের ১১ ডিসেম্বর। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যে শীতল সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, সেই প্রেক্ষাপটে এই চুক্তি নবায়নের সম্ভাবনা কতটুকু?
চুক্তিটি নবায়নের আলাপ তো অনেক দিন ধরেই চলছে। বাংলাদেশ-ভারত যৌথ নদী কমিশনে ‘গঙ্গা চুক্তি বাস্তবায়ন কারিগরি কমিটি’ রয়েছে।
এই বছর মে মাসে তারা তাদের ৯০তম বৈঠক করেছে। এ ছাড়া দেখবেন, শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকাকালে যখনই ভারতে গেছেন বা ভারতের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে এসেছেন, প্রতিবারই যৌথ ঘোষণায় একটা অনুচ্ছেদ থাকত যে, গঙ্গার পানি চুক্তি নবায়নের ব্যাপারে কারিগরি কমিটি কাজ করছে এবং তা যথাসময়ে করা হবে। কিন্তু বিষয়টি তখনো সহজ ছিল না। ভারতের দিক থেকে বলা হতো, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গঙ্গায় আগের মতো পানি নেই। সেই ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পঙ্কজ সরণ লিখেছিলেন, কেবল অভিন্ন নদীর পানিপ্রবাহ নয়, পানি ঘাটতিও বণ্টন হতে হবে। তার মানে, নবায়ন নিয়ে ভারত আগে থেকেই রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্যাঁচ দিচ্ছিল।
রাজনৈতিক প্যাঁচ কী রকম?
শেখ রোকন: দেখবেন, বিহারের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে নীতীশ কুমার বলেছিলেন, ফারাক্কা ব্যারাজ ভেঙে দেওয়া উচিত। কারণ, এটা বিহারে বন্যা ও ভাঙন তৈরি করছে। কিন্তু এখন তাঁরই দল জনতা দল ইউনাইটেড থেকে রাজ্যসভায় আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি তোলা হচ্ছে, গঙ্গা চুক্তি যেন নবায়ন না করা হয়। গত শুক্রবার দলটির পক্ষে পাটনায় কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে যে বিহারের গঙ্গার তীরবর্তী ১২টি জেলায় চুক্তি নবায়নবিরোধী সমাবেশ হবে। পশ্চিমবঙ্গের দিক থেকেও বিরোধিতা আছে; কিন্তু কেন্দ্র ও রাজ্যে একই দলের সরকার থাকায় তারা প্রকাশ্যে মুখ খুলছে না। যদিও ভারতীয় পত্রিকারই খবর, কলকাতা ইতিমধ্যে দিল্লিকে দাপ্তরিকভাবে জানিয়ে দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে আলোচনা না করে চুক্তি নবায়ন করা যাবে না।
যে চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে, সেটার মূল্যায়নটা জানতে চাই?
শেখ রোকন: এখন যে চুক্তিটা আছে, এর কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। প্রথমত, এটা একটা মেয়াদি চুক্তি। সমঝোতা বা ‘এগ্রিমেন্ট’ মেয়াদি হতে পারে, কিন্তু চুক্তি বা ‘ট্রিটি’ সাধারণত মেয়াদি হয় না। এমনকি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সিন্ধু নদীর পানি বণ্টন চুক্তিও মেয়াদি নয়, স্থায়ী। মেয়াদ থাকলেও সেটা ৭৫-১০০ বছর মেয়াদি হয়, যেমন ভারত ও নেপালের মহাকালী ট্রিটি। কিন্তু বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে গঙ্গা চুক্তি মাত্র ৩০ বছর মেয়াদি।
দ্বিতীয়ত, গঙ্গা অববাহিকায় অন্তত তিনটা দেশ আছে—নেপাল, ভারত ও বাংলাদেশ। গঙ্গার কোনো কোনো উপনদীর ক্ষেত্রে চীনও এই অববাহিকার অংশ। যেমন কিছুদিন আগে নেপালে যে ত্রিশুলি ও ভোতেকোশী নদীতে বিপর্যয় হলো, সেগুলোর উৎস চীনে। তার মানে, অন্তত তিনটা দেশ মিলে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু এটা দ্বিপক্ষীয়।
তৃতীয়ত, গঙ্গা চুক্তির প্রবাহ মাপা হয় ফারাক্কা পয়েন্টে। কিন্তু তার আগে আরও ২০০০ কিলোমিটার গঙ্গা আছে। ফারাক্কার উজানের পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খন্ড, বিহার, উত্তর প্রদেশ, উত্তরাখন্ড—এই পাঁচ রাজ্যে মোট ২৯টা ছোট-বড় প্রকল্প আছে। এগুলোর পানি প্রত্যাহারের ক্ষমতা ২ লাখ ৯২ হাজার কিউসেক। তার মানে, ফারাক্কায় ৭০ থেকে ৮০ হাজার কিউসেক পানি ভাগাভাগি করছি আমরা, অথচ তার আগেই প্রায় চার গুণ পানি প্রত্যাহারের ক্ষমতাসম্পন্ন স্থাপনা রয়েছে। ফারাক্কা পয়েন্টের বদলে গোটা নদীর পানির হিসাব করা উচিত ছিল। তারপর তো ভাগাভাগি।
চতুর্থত, গঙ্গা চুক্তির মধ্যে কোনো সালিসি ব্যবস্থা নেই। এর ৭ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, মতবিরোধ দেখা দিলে দুই পক্ষ আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করবে। ওদিকে সিন্ধু চুক্তিতে বলা আছে, মতবিরোধ দেখা দিলে বিশ্বব্যাংক মীমাংসা করবে। অন্যান্য দেশের চুক্তিতেও সালিসি ব্যবস্থা থাকে, গঙ্গা চুক্তিতে নেই।
বর্তমান চুক্তির মেয়াদ ছিল ৩০ বছর। তিন দশকের বাস্তবতায় বাংলাদেশের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি কেমন ছিল?
শেখ রোকন: চুক্তিতে পানি ভাগাভাগির যে ফর্মুলা ছিল, সেটা কারিগরিভাবে মোটামুটি কাজ করেছে। কিন্তু বিষয়টি প্রতিবেশগত দিক থেকে বুঝতে হবে। বাংলাদেশের প্রতিবেশব্যবস্থায় শত শত বছর ধরে যে পানি গঙ্গা দিয়ে আসত, সেখান থেকে ৩৫-৪০ হাজার কিউসেক পানি ফারাক্কা ব্যারাজের মাধ্যমে ৩০ বছর ধরে প্রত্যাহার করে ভাগীরথীতে নেওয়া হয়েছে। গঙ্গার সঙ্গে যে ভাগীরথীর সংযোগ ১০০ বছর আগেই শুকিয়ে গিয়েছিল, ওদিক দিয়ে সামান্য পানি যেত। তার মানে, ফারাক্কা ব্যারাজ স্থাপনের পর থেকে বাংলাদেশের গঙ্গায় ৩৫-৪০ হাজার কিউসেক পানি কম আসা শুরু হয়েছে। গঙ্গার পানি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মাথাভাঙ্গা, কুমার, ভৈরব, নবগঙ্গা, গড়াই, মধুমতী, চন্দনা নদী দিয়ে প্রবাহিত হতো। গঙ্গায় পানি কম আসায় এই নদীগুলো সব শুকিয়ে গেছে। গঙ্গার পানি এসব নদী দিয়ে সুন্দরবনে যেত। দেখা যাচ্ছে, সুন্দরবনে মিঠা পানি কম যাওয়ায় সেখানকার গাছে আগামরা রোগ দেখা দিয়েছে। উজান থেকে আসা মিঠা পানি লবণাক্ত পানিকে সাগরের দিকে ঠেকিয়ে রাখত। উজানের সেই চাপ কমে যাওয়ায় উপকূল থেকে উজানের দিকে লবণাক্ততা বাড়ছে।
এ ছাড়া আর কী প্রভাব রয়েছে?
শেখ রোকন: গঙ্গায় যখন স্বাভাবিক প্রবাহ ছিল, সিলটেশন বা পলি বা তলানিপ্রবাহ সাগরে চলে যেত, সেখানে নতুন ভূমি গঠন হতো। কিন্তু পানি যখন ৩৫-৪০ হাজার কিউসেক কম আসছে, তখন পলির বড় অংশ সাগরে না গিয়ে মাঝপথে আটকে যাচ্ছে। নদী খাত উঁচু হয়ে যাচ্ছে। এতে একদিকে নৌচলাচল ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে ভাঙন বাড়ছে। যে কারণে গত ৫০ বছরে গঙ্গায় ভাঙন অনেক বেড়ে গেছে। নদীর পানিস্বল্পতা ও অগভীরতার প্রভাব মৎস্যসম্পদেও পড়ছে।
গঙ্গা নিয়ে ১৯৭৭ সালে আরেকটি চুক্তি হয়েছিল। দুই চুক্তির মধ্যে তুলনা করলে কী বলবেন?
শেখ রোকন: দুই চুক্তিরই কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কোনো চুক্তিই আদর্শ চুক্তি হয়নি। ১৯৯৬ সালের চুক্তির চারটি সীমাবদ্ধতার কথা আগেই বলেছি। বরং ৩০ বছরের তুলনায় পাঁচ বছর মেয়াদ আরও কম। ১৯৭৭ ও ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে এগুলো ছাড়াও আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো, এতে দুই দেশ মিলে শুকনো মৌসুমে গঙ্গায় প্রবাহ বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। ১৯৭৭ সালের চুক্তিতে তো শিরোনামেই বলা হয়েছে ‘অগমেন্টিং ইটস ফ্লোজ’। এর মানে দুই দেশ মিলে গঙ্গায় পানি বাড়াতে হবে। কীভাবে বাড়াবে? ভারত বলছে, ব্রহ্মপুত্র থেকে এক লাখ কিউসেক পানি নিয়ে গঙ্গায় দেওয়া হোক, বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে একটা খাল খনন করে। আবার বাংলাদেশ বলছে, নেপালে জলাধার তৈরি করে সেখান থেকে শুকনো মৌসুমে পানি বাড়ানো হোক। এটা একটা অদ্ভুত ব্যাপার। ভাটির দেশ কেন গঙ্গায় প্রবাহ বাড়ানোর দায়িত্ব নেবে?
- ট্যাগ:
- মতামত
- গঙ্গা
- পানি চুক্তি
- নবায়ন
- আত্মঘাতী