বাংলাদেশ বিমানের হালহকিকত ও কিছু পর্যবেক্ষণ
বাংলাদেশ বিমানের জন্য উড়োজাহাজ কেনা বিষয়ে বেশ আলাপ-আলোচনা চলছে ইদানীং।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যখন ঘোর দর-কষাকষি চলছে, তখন বোয়িং কোম্পানির ১৫টি বিমান কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথমে বোয়িং থেকে আরও ১০টি এবং সম্প্রতি ইউরোপের এয়ারবাস কোম্পানি থেকে আরও ১০টি জাহাজ কিনছে বিমান। সাকল্যে বাংলাদেশ বিমান ৩৫টি জাহাজ কিনবে।
জাহাজগুলো কিনতে যে বিপুল ব্যয়, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় তা কীভাবে নির্বাহ করা হবে, এ নিয়ে অনেকেই তাঁদের অস্বস্তির কথা ব্যক্ত করছেন। জাহাজগুলো আগামী ১০ থেকে ১২ বছরে বিমানের বহরে যুক্ত হবে।
বাংলাদেশ বিমান নিয়ে আমার একটু বেশি আগ্রহের কারণ খানিকটা এই যে ২০০৭ সালে বিমান করপোরেটাইজ করার সময়, প্রথম যে পরিচালনা পরিষদ নিয়োগ করা হয়, পররাষ্ট্রসচিব হওয়ার সুবাদে সেই পরিষদে আমি ছিলাম একজন সদস্য। ১০০ টাকা মূল্যের একটি করে শেয়ার কিনে আমরা সাতজন এর শেয়ার হোল্ডার হই। অর্থাৎ বিমানের মোট শেয়ারের মূল্য ছিল ৭০০ টাকা। মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার সাহেব ছিলেন চেয়ারম্যান। এমডি ছিলেন মোহাম্মদ আবদুল মোমেন, যিনি পরবর্তীকালে দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হয়েছিলেন।
এ সময় বিমান বোয়িং থেকে ১০টি উড়োজাহাজ কেনে। পরবর্তী ১৭ বছরে আর ৬টি বোয়িং জাহাজ শুধু বিমানবহরে যুক্ত হয়। ছোট আকারের ড্যাশ উড়োজাহাজগুলো এ হিসাবের বাইরে।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বাংলাদেশ বিমান একটি অত্যন্ত ছোট বিমান পরিবহন সংস্থা। ১০টি ওয়াইড বডি এবং ৬টি ন্যারো বডি বোয়িং, সেই সঙ্গে ৫টি ছোট ড্যাশ জাহাজ নিয়ে বহর। আফ্রিকার ইথিওপিয়ান এয়ারলাইনসের জাহাজ আছে দেড় শর বেশি। এয়ার আলজেরির আছে ছাপ্পান্নটি। এমনকি কেনিয়া এয়ারওয়েজেরও ৩৫টি জাহাজ আছে। তিউনিস এয়ারের আছে ৩০টি।
আগামী ১০ থেকে ১২ বছরে যদি ৩৫টি জাহাজের সবগুলো বিমানে যুক্ত হয়, তারপরও এটি একটি ছোট প্রতিষ্ঠানই থেকে যাবে। এর মধ্যে ২০ বছর আগে কেনা জাহাজগুলো কিছু কিছু করে ব্যবহারযোগ্যতা হারাবে। কাজেই বিমানের আকার যে খুব বেশি বড় হয়ে যাবে, তা নয়।
এ রকম ছোট একটি বহরের জন্য বোয়িং এবং এয়ারবাস দুটো কোম্পানি থেকে জাহাজ কেনার যুক্তিটা ঠিক বোধগম্য হলো না। কারণ, দুই রকম জাহাজ কিনলে প্রশিক্ষণ, ইনভেনটরি, রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত ইত্যাদির খরচ বেড়ে যায়। যাদের বিমানবহরে শতাধিক জাহাজ থাকে, তারা সাধারণত এ রকম দুদিক থেকেই কেনে, একধরনের ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য। কিন্তু বিমানের মতো ছোট আকারের বহর নিয়ে বড় জাহাজগুলো দুটো কোম্পানি থেকে কেনা প্রতিষ্ঠানের জন্য লাভজনক হবে কি না, এ নিয়ে আমার এবং আরও অনেকেরই সন্দেহ রয়ে গেছে।
আর উড়োজাহাজ শুধু কিনলেই তো হবে না। সেই জাহাজগুলো তো চালাতেও হবে। এত ছোট বহর সত্ত্বেও রেকর্ড ঘাঁটলে দেখা যায়, বিমানের জাহাজগুলোর প্রকৃত ব্যবহারের মাত্রা অন্যান্য দেশের একই বয়সের জাহাজের তুলনায় অনেক কম। অর্থাৎ বিমানের যে সম্পদ আছে, সেটাই সে দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করতে পারছে না। এই দক্ষতা না বাড়িয়ে জাহাজের সংখ্যা বাড়ালে অপচয়ের মাত্রাই বৃদ্ধি পাবে শুধু।
অন্যদিকে অনেক কম চলা সত্ত্বেও বিমানের জাহাজগুলোর যে অবস্থা, অন্য এয়ারলাইনসের অনেক বেশি চলা সমবয়সী জাহাজগুলোর অবস্থা বরং এর চেয়ে ভালো। এর কৃতিত্ব বেশ খানিকটা দিতে হবে আসলে বিমানের প্রকৌশল বিভাগকে। কারণ, জাহাজগুলো ভালোভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা তাদের কাজ। বিভিন্ন সময় প্রকৌশল বিভাগের কর্তব্যনিষ্ঠা নিয়েও বেশ সমালোচনা হয়েছে।
আমি বিদেশে যাওয়ার সময় যথাসম্ভব বাংলাদেশ বিমান ব্যবহারের চেষ্টা করেছি। রিয়াদগামী জাহাজ চট্টগ্রাম হয়ে যায়, আবার ফিরে আসে সিলেট হয়ে। এটা একাধারে যাত্রীদের জন্য বিরক্তিকর, বিমানের জন্যও অলাভজনক। কারণ, একটা নির্দিষ্টসংখ্যক অবতরণের পর বিমানের ল্যান্ডিং গিয়ার ওভারহল করতে হয়, যা ব্যয়সাপেক্ষ। আধা ঘণ্টার ফ্লাইটের জন্য এত বড় জাহাজগুলোকে একটা অতিরিক্ত ল্যান্ডিং করতে হয়। রাজনীতিকেরা স্থানীয় জনগণকে সন্তুষ্ট করতে গিয়ে এরূপ ক্ষতিকর সিদ্ধান্ত নেন।
- ট্যাগ:
- মতামত
- বাংলাদেশ বিমান
- পর্যবেক্ষণ