অর্থের বন্দোবস্ত না বদলালে বদলাবে না রাজনীতির বন্দোবস্ত

বিডি নিউজ ২৪ সাজ্জাদ সাব্বির প্রকাশিত: ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১৩:৫৫

বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের আলোচনায় আমরা সাধারণত রাষ্ট্র সংস্কার, সাংবিধানিক ভারসাম্য, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, জবাবদিহি আর নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার কথাই বেশি শুনি। কিন্তু এই বন্দোবস্তের একটা মৌলিক দিক প্রায়ই অন্তরালে থেকে যায়। রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনের পেছনে অর্থ একটি বড় নিয়ামক, আর ওই অর্থের উৎস ও ব্যবহারের ওপরই নির্ভর করে রাজনীতিতে কারা আসার সুযোগ পাবেন, কারা নেতৃত্বে বসবেন এবং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে কার স্বার্থ প্রাধান্য পাবে।


নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত বলতে আমি এমন এক রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার কথা বুঝি, যেখানে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কোনো ব্যক্তি, পরিবার, দলীয় গোষ্ঠী, আমলা বা ধনী ব্যবসায়ী শ্রেণির একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে থাকবে না। ক্ষমতা অর্জন, প্রয়োগ ও হস্তান্তরের নিয়মগুলো হবে স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক ও জবাবদিহিমূলক। নাগরিকের অধিকার কেবল সংবিধানের পাতায় বন্দী না থেকে বাস্তব রাজনীতিতেও প্রতিফলিত হবে। একই সঙ্গে নাগরিককে সেবার জন্য রাষ্ট্রের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হবে না, বরং রাষ্ট্র নিজেই সেবা নিয়ে নাগরিকের দোরগোড়ায় পৌঁছে যাবে। এই লক্ষ্য অর্জনে সংবিধান ও নির্বাচনব্যবস্থার সংস্কার যেমন দরকার, তেমনি রাজনৈতিক অর্থায়নের গলদপূর্ণ কাঠামোটি বদলে ফেলা তার চেয়েও বেশি জরুরি।


অর্থনৈতিক বিশ্লেষক মুশতাক এইচ খান তার ‘পলিটিক্যাল সেটেলমেন্ট অ্যান্ড অ্যানালিসিস অব ইনস্টিটিউশনস’ গবেষণায় এ বিষয়ে একটি কার্যকর তাত্ত্বিক কাঠামো উপস্থাপন করেছেন। তার রাজনৈতিক বন্দোবস্ত তত্ত্ব অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও নীতি কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করে সমাজের বিভিন্ন দল ও গোষ্ঠীর সংগঠিত ক্ষমতা, স্বার্থ এবং তাদের দরকষাকষির শক্তির ওপর। কেবল আইনের সুন্দর ভাষা দিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা বিচার করা যায় না। কাগজে-কলমে সমান অধিকারের কথা লেখা থাকলেও বাস্তবে সবার প্রভাব সমান হয় না। যেসব গোষ্ঠীর আর্থিক ও সাংগঠনিক ক্ষমতা বেশি, তারা আইন ও নীতির প্রয়োগকে নিজেদের সুবিধামতো ঘুরিয়ে নিতে পারে। ‘ইনস্টিটিউশনস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ অধ্যায়েও তিনি দেখিয়েছেন, উন্নয়নকে সঠিকভাবে বুঝতে হলে শুধু আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানের দিকে তাকালেই চলবে না, ক্ষমতার বাস্তব বণ্টনকেও বুঝতে হবে। মুশতাক এইচ খানের এই দুটি গবেষণার আলোকেই রাজনৈতিক অর্থায়নকে রাষ্ট্র সংস্কারের প্রধান বিষয় হিসেবে দেখা প্রয়োজন।


রাজনীতির অর্থায়ন মূলত এই ক্ষমতা বণ্টনেরই একটি মৌলিক ক্ষেত্র। দল চালানো, কর্মী সামলানো, প্রচার চালানো, নির্বাচনি এলাকায় প্রভাব ধরে রাখা কিংবা জনমত তৈরি করা, সবকিছুতেই অর্থের প্রয়োজন। টাকাপয়সার প্রয়োজনীয়তাকে অস্বীকার করে গণতান্ত্রিক রাজনীতি চালানো অসম্ভব। আসল সংকট তৈরি হয় তখন, যখন এই অর্থের উৎস থাকে অস্বচ্ছ, অনুদানের বিনিময়ে অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার লেনদেন চলে এবং আর্থিক সামর্থ্যই রাজনীতি করার প্রধান যোগ্যতা হয়ে ওঠে। তখন নাগরিকের রাজনীতিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ খাতা-কলমে সমান মনে হলেও বাস্তব ময়দানে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রটি চরম অসম হয়ে পড়ে।


বাংলাদেশের নির্বাচনি ব্যয়ের তথ্য এই আশঙ্কার বাস্তব প্রমাণ দেয়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ২০২৬ সালের নির্বাচনি পর্যবেক্ষণে ৩০০টি আসনের মধ্য থেকে দৈবচয়নের ভিত্তিতে ৭০টি আসন নমুনা হিসেবে গ্রহণ করে। তাদের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব আসনে প্রার্থীদের গড় নির্বাচনি ব্যয় ছিল প্রায় ১ কোটি ১৯ লাখ টাকা, অথচ সরকারের অনুমোদিত গড় ব্যয়সীমা ছিল মাত্র ৪৪ লাখ ২৫ হাজার টাকার মতো। শতকরা প্রায় ৬৮.৬ ভাগ প্রার্থী নির্ধারিত ব্যয়সীমা ছাপিয়ে গেছেন। আর যারা সীমা অতিক্রম করেছেন, তাদের গড় ব্যয় ছিল প্রায় ১ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। এই নমুনা দিয়ে হয়তো সব প্রার্থীর পূর্ণাঙ্গ চিত্র একবারে আঁকা যাবে না, তবে আমাদের নির্বাচনি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও যাচাইয়ের সক্ষমতা নিয়ে একটি বড় প্রশ্ন তুলে দেয়।


একই প্রতিবেদনে ২০২৫ সালের ২২ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ফেইসবুকে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের বিজ্ঞাপন ব্যয়ের একটি চিত্র উঠে এসেছে। দেখা গেছে, কেবল ফেইসবুক প্রচারণাতেই বিএনপি ও তাদের প্রার্থীদের ব্যয় ছিল প্রায় ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮৭ হাজার টাকা, জামায়াতে ইসলামী ও তাদের প্রার্থীদের প্রায় ১ কোটি ৩৫ লাখ ১৮ হাজার টাকা এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থীরা খরচ করেছেন প্রায় ১০ লাখ ৮৩ হাজার টাকা। এটিও পুরো ডিজিটাল প্রচারের সামগ্রিক চিত্র নয়। তবু সনাতন নির্বাচনি ব্যয়ের পাশাপাশি ডিজিটাল মাধ্যমের অর্থায়নেও যে স্বচ্ছতা আনা জরুরি, তা পরিষ্কার বোঝা যায়।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও