দারিদ্র্য কমেছে, কিন্তু বৈষম্য কি কমেছে?
একই শহরে পাশাপাশি দুটি দৃশ্য দেখা যায়। একদিকে বহুতল ভবনের কাচঘেরা জানালায় আলো জ্বলে, রেস্তোরাঁয় মানুষের ভিড়, নতুন গাড়ির সারি, শপিংমলে কেনাকাটার ব্যস্ততা। অন্যদিকে সেই শহরেরই কোনো এক গলিতে একটি পরিবার মাসের শেষ কদিনের বাজারের হিসাব মিলিয়ে দেখে—চাল আছে, কিন্তু ডিম কেনার টাকা নেই; শিশুর ওষুধ লাগবে, তাই আজ মাছ বাদ।
দুটি দৃশ্যই বাংলাদেশের বাস্তবতা। একটিকে অস্বীকার করে অন্যটিকে বোঝা যাবে না।
বাংলাদেশ দারিদ্র্য কমানোর ক্ষেত্রে গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। ২০১০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ৩৭ দশমিক ১ শতাংশ থেকে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে নেমেছে। চরম দারিদ্র্যও ১২ দশমিক ২ শতাংশ থেকে ৫ দশমিক ৬ শতাংশে কমেছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ওই সময়ে প্রায় ৩ কোটি ৪০ লাখ মানুষ দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে এসেছে। বিদ্যুৎ, স্যানিটেশন, শিক্ষা ও অন্যান্য মৌলিক সেবায়ও মানুষের প্রবেশাধিকার বেড়েছে।
এই অর্জন ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। একটি দরিদ্র দেশ থেকে নিম্নমধ্যম আয়ের অর্থনীতিতে উত্তরণের পথে এটি বাংলাদেশের অন্যতম বড় সামাজিক পরিবর্তন। কিন্তু গল্পের দ্বিতীয় অংশটি আরও অস্বস্তিকর।
দারিদ্র্য কমেছে, অথচ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছায়নি। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ বলছে, ২০১৬ সালের পর বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি আগের তুলনায় কম অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়েছে। সবচেয়ে দরিদ্র মানুষের ভোগব্যয়ের উন্নতি হয়েছে তুলনামূলকভাবে কম, অথচ মধ্য ও উচ্চ আয়ের মানুষের সুবিধা বেড়েছে। আয়বৈষম্যের গিনি সূচক ২০১০ সালের ০ দশমিক ৫০ থেকে ২০২২ সালে ০ দশমিক ৫৩-এ উঠেছে। এখানেই দারিদ্র্য আর বৈষম্যের পার্থক্যটি বুঝতে হবে।
দারিদ্র্য হলো একজন মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় সম্পদ বা আয় কতটা কম। আর বৈষম্য হলো সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের মধ্যে সম্পদ, আয় ও সুযোগের দূরত্ব কতটা। একটি দেশের দরিদ্র মানুষের সংখ্যা কমতে পারে, কিন্তু একই সময়ে ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধান বাড়তে পারে।
বাংলাদেশে সেই বাস্তবতাই ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের হিসাবে, জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে ২১ দশমিক ৪ শতাংশে বেড়েছে। একই সময়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিম্ন আয়ের মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। অর্থাৎ যারা কোনোভাবে দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠেছিলেন, তাঁদের একটি অংশ আবার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছেন।
আরও উদ্বেগের বিষয়, বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ২০২২ সালে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে ছিলেন—অর্থাৎ তাঁরা তখন দারিদ্র্যসীমার ওপরে থাকলেও অসুস্থতা, বেকারত্ব, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অন্য কোনো বড় ধাক্কা তাঁদের আবার দরিদ্র করে দিতে পারে।
এমন মানুষকে আমরা কী বলব—দরিদ্র, না মধ্যবিত্ত? পরিসংখ্যানের ঘরে হয়তো তাঁরা দরিদ্র নন। কিন্তু বাস্তব জীবনে তাঁদের নিরাপত্তা এতটাই ভঙ্গুর যে একটি হাসপাতালের বিল, একটি চাকরি হারানো কিংবা একটি বড় বন্যা পুরো সংসারের হিসাব বদলে দিতে পারে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- বৈষম্য
- দারিদ্র্য বিমোচন