দুর্গাপূজার অর্থনীতি : ধর্মীয় উৎসব থেকে অর্থনীতির উৎস
মহালয়ার পর থেকে বাংলার প্রতিটি হিন্দু পরিবারে দুর্গাপূজার আমেজ শুরু হয়ে যায়, যদিও পূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় ষষ্টি পূজার মধ্য দিয়ে। শরতের এসময়ে দেশজুড়ে প্রতিটি পূজামণ্ডপ শঙ্খ আর ঢাকের আওয়াজে মুখরিত হয় এবং নানান আলোক সজ্জায় ও রঙে সেজে ওঠে।
দুর্গাপূজা উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, এবার সারা দেশে প্রায় ৩৩,৮৫০টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। এবার পূজায় সরকারি ছুটি ৩ দিন করা হয়েছে এবং সাপ্তাহিক ছুটিসহ মোট ছুটি ৫ দিনে দাঁড়াবে।
বাংলাদেশে দুর্গাপূজা শুধুমাত্র হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয় উৎসব হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকে না, কালের পরিক্রমায় তা লাখো বাংলাদেশির কাছে সংস্কৃতি ও সম্প্রীতির উৎসবে পরিণত হয়েছে।
দুর্গাপূজার মূল আচার-অনুষ্ঠান, আলোকসজ্জা, গান ও আনন্দ-উৎসবের বাইরেও এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক মাত্রা রয়েছে। সপ্তাহব্যাপী পূজার সামগ্রিক কর্মযজ্ঞ এক বিশাল অর্থনৈতিক লেনদেনের ক্ষেত্র তৈরি করে, যা কর্মসংস্থান বাড়ায়, ভোক্তা ব্যয় বৃদ্ধি করে, ক্ষুদ্র ব্যবসাকে শক্তিশালী করে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে গতি আনয়ন করে।
২০২২ সালের জনশুমারির হিসাব অনুযায়ী, দেশে হিন্দু জনগোষ্ঠী প্রায় ৮ শতাংশ। তাদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব হলো দুর্গাপূজা। সময়ের সাথে সাথে ঈদ ও পয়লা বৈশাখের মতো দুর্গাপূজাও একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক মৌসুমে পরিণত হয়েছে, যার প্রভাব পড়ে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন, পরিবহন, ফ্যাশন, খাদ্য এবং হস্তশিল্প খাতে।
২০২৫ সালে বাংলাদেশে মোট ৩৩,৩৫৫টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা উদযাপিত হয়েছে, যার মধ্যে ঢাকায় ছিল ২৫২টি মণ্ডপ। পূজামণ্ডপের এই সংখ্যা উৎসবটির ব্যাপকতা এবং এর সঙ্গে যুক্ত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিধি স্পষ্ট করে।
শারদীয় দুর্গোৎসব ঘিরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু হয় পূজার কয়েক মাস আগে থেকেই এবং এর প্রভাব বিস্তৃত হয় বিভিন্ন খাতে। প্রতিটি মণ্ডপে প্রতিমা নির্মাণ, সাজসজ্জা, আলোকসজ্জা, সাউন্ড সিস্টেম, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ফুলফল এবং পরিবহন ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়। ফলে কয়েক মাস আগেই শুরু হয়ে যায় একটি বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মৃৎশিল্পী থেকে শুরু করে বাঁশ ব্যবসায়ী, কাঠমিস্ত্রি, রংমিস্ত্রি ও বিদ্যুৎকর্মী—হাজারও মানুষের জীবিকা নির্ভর করে এই উৎসবকে ঘিরে। পোশাকের দোকান, মিষ্টির দোকান ও পরিবহন ব্যবসা থেকে শুরু করে কারিগর, সাজসজ্জাকর্মী, সংগীতশিল্পী ও পর্যটন ব্যবসা—বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ পূজার মৌসুমি অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হন।
দুর্গাপূজায় সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয় প্রতিমা ও মণ্ডপ তৈরিতে। প্রতিমা শিল্পীরা মাটি, খড়, বাঁশ, কাঠ, রং, অলংকার ও অন্যান্য উপকরণ সংগ্রহ করেন। একই সময়ে মণ্ডপ সাজানোর জন্য নিয়োগ দেওয়া হয় ডেকোরেটর, বিদ্যুৎকর্মী, সাউন্ড সিস্টেম পরিচালনাকারী এবং সাংস্কৃতিক কর্মীদের।
অনেক কারিগরের জন্য এটি কেবল মৌসুমি কাজ নয়; বরং বছরের গুরুত্বপূর্ণ একটি আয়ের উৎস। ঢাকা, চট্টগ্রাম, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, খুলনা ও নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিমা নির্মাণের জন্য বাণিজ্যিক কারখানা রয়েছে। এসব কারখানায় শত শত মৃৎশিল্পী ও তাদের সহকারীরা প্রতিমা তৈরির কাজে যুক্ত থাকেন। যা তাদের আদি এবং একমাত্র পেশা। দুর্গাপূজার সময়েই তারা সবচেয়ে বেশি প্রতিমা নির্মাণ করে থাকে।
বর্তমানে ব্যবসায়ীরা দুর্গাপূজাকে কেনাকাটার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মৌসুম হিসেবে বিবেচনা করে থাকে। দৈনিক ‘ডেইলি স্টার’-এর এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের বার্ষিক উৎসবভিত্তিক বিক্রয়ের প্রায় ৭০ শতাংশ আসে দুই ঈদ থেকে, আর প্রায় ১০ শতাংশ আসে দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে, যা এটিকে দেশের অন্যতম বৃহৎ ভোক্তা বাজারে পরিণত করেছে।
পূজার সময়ে পোশাকের দোকানগুলোয় ক্রেতাদের আনাগোনা বৃদ্ধি পায়। ফ্যাশন হাউসগুলো এখন আলাদা পূজা কালেকশন বাজারে আনে। দুর্গাপূজার সময়েও শাড়ি, পাঞ্জাবি, শার্ট, সালোয়ার-কামিজ, গয়না, প্রসাধনী, জুতা এবং শিশুদের পোশাকের চাহিদা বেড়ে যায়।
খুচরা বাজারেও দুর্গাপূজার দৃশ্যমান অর্থনৈতিক প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। উৎসবকে কেন্দ্র করে শুধু পোশাক নয়, মিষ্টি, খাবার, ফুল, উপহারসামগ্রী, মোবাইল ফোন, গৃহসজ্জা সামগ্রী এবং ইলেকট্রনিক পণ্যের চাহিদাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারীর মতে, তাদের প্রতিষ্ঠানের পূজাভিত্তিক বিক্রি প্রতিবছর ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।