সংস্কৃতির সংকট, জাতীয় স্বার্থ ও বন্দর রক্ষা
বহুদিন ধরেই চর্চিত বিষয়টি নিয়ে আবারও রবীন্দ্রনাথের ছবিতে কালি লেপনের ঘটনাটি সবার ক্ষোভের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মুষ্টিমেয় কিছু সাম্প্রদায়িক শক্তি, বিশেষ করে যারা ভ্রান্ত পথে ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার করে থাকে, তারা কিছু মিথ্যা স্পাই গাওয়ার চেষ্টা করছে।
অনেক আগে থেকে অভিযোগ আছে, এই মিথ্যা সাফাইয়ের কাজে উসকানিদাতা হলেন একজন স্বঘোষিত বুদ্ধিজীবী, যিনি পেশায় অধ্যাপক। তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় অভিযোগ উঠেছে, তিনি এসব ঘটনার ডাল-পালা ছড়ানোর অন্যতম কুশীলব।
পৃথিবীর ইতিহাসে এমনটা ঘটেছে কি না তা জানা নেই। একটি ঔপনিবেশিক শক্তি একটি রক্তাক্ত যুদ্ধে যখন আত্মসমর্পণ করে, তার লেজুড়রাও সহসাই নিষ্ক্রিয় হয়ে বাঁচার পথ খোঁজে ও এদিক-সেদিক পালায় এবং মূল স্রোতের দ্বারা ধিক্কৃত হয়। অবশ্যই আমাদের দেশ সেদিক দিয়ে বড় ব্যতিক্রম। তারা মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছে। রাজাকার, আলবদর সেজে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিজয়কে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে। সাম্প্রদায়িক শক্তিকে উসকে দিয়েছে। এবং রাষ্ট্রক্ষমতার অংশী হয়েছে।
মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে তারা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার পাঁয়তারা করছে। এসব জনগণ প্রত্যাখ্যান করলেও তারা থামেনি। বাংলার যেসব ব্যক্তিত্ব বিশ্বের দরবারে আমাদের ভাষা এবং সাহিত্যকে প্রতিষ্ঠা করেছেন, তাঁদেরকেও সুযোগ পেলেই ভারতীয় ট্যাগ দিয়ে নানাভাবে অসম্মানিত করার প্রাণপণ চেষ্ট করেছে। আমাদের পতাকা, জাতীয় সংগীত—এসবকেও প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ তাদের সব সময় প্রত্যাখ্যান করেছে। ভবিষ্যতেও তাদের আস্তাকুঁড়ে অবশ্যই নিক্ষেপ করবে এ দেশের শুভবোধসম্পন্ন জনগণ।
কিছুদিন ধরেই চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনাল বিদেশিদের কাছে ইজারা দেওয়াকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী আন্দোলন চলমান আছে। জাতীয় স্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে এভাবে একটা লাভজনক টার্মিনালকে বিদেশি কোম্পানির কাছে দেওয়ার বিরুদ্ধে একমাত্র বামপন্থীরা আন্দোলন সংগঠিত করার চেষ্ট চালিয়ে যাচ্ছে। এসব বিষয় নিয়ে প্রধান বিরোধী দলের কোনো ধরনের প্রতিবাদ ও বিরোধিতা চোখে পড়ছে না। এ জায়গায় সরকার আর বিরোধী দল যেন এক সুতোয় সমান্তরালে দাঁড়িয়ে গেছে। পাশাপাশি জাতীয় স্বার্থ নিয়ে এই শক্তির লোকজনও টুঁ শব্দ করছে না। ইরানে মার্কিন হামলা বা গাজায় মুসলিম নিধন এ ব্যাপারে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। জুলাই আন্দোলনের পরপরই আমাদের দেশের শত শত কলকারখানা বন্ধ করা হলো, লাখ লাখ শ্রমিক বেকার হয়ে গেলেন। কিন্তু তাঁদের নিয়ে এরা কোনো একটি কথাও বলল না।
কয়েক মাস ধরে সাবেক প্রধান উপদেষ্টার নতুন ব্যবসার কারণে যে হামে শত শত শিশু মারা গেল, সে ব্যাপারেও তাদের কোনো কথা নেই। কিন্তু এ রকম জরুরি সব বিষয়কে ধামাচাপা দেওয়ার জন্য তারা এবং তাদের শিষ্যরা প্রস্তুত। রবীন্দ্রনাথকে ভারতীয় প্রমাণ করো এবং তাকে হিন্দু প্রমাণ করো। তারা কি জানে না যে রবীন্দ্রনাথ হিন্দু ছিলেন না, তিনি ছিলেন ব্রাহ্ম এবং জন্মগতভাবে বাঙালি। তাঁর জীবদ্দশায় পাকিস্তান হয়নি।
আসলে মূল সমস্যাতে মুখ ঘোরানোর জন্য যে এইসব হঠাৎ আবিষ্কার, তার মূলেও রয়েছে সাম্প্রদায়িকতা। সময়টা বেছে নিয়েছে যে সামনে দুর্গাপূজা, এর আগেই একটা উত্তেজনা সৃষ্টি করা যায় কি না। কিন্তু এর মধ্যেই দুর্গাপূজায় যাতে কোনো বিশৃঙ্খলা না হয়, সে ব্যাপারে তাদের নেতা রীতিমতো জিহাদি মনোভাব নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় বক্তৃতা দিয়ে যাচ্ছেন। এই বক্তৃতার ভাষায় এমন প্রমাণিত হয় যে দুর্গাপূজায় যেন সংকট হয়েই থাকে এবং তিনি তলোয়ার নিয়ে নামবেন যাতে কোথাও কোনো সংকট না থাকে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- সংকট
- সংস্কৃতি
- জাতীয় স্বার্থ