প্রক্রিয়াজাতকরণ ছাড়া প্রাকৃতিক সম্পদে মূল্য সংযোজন ঘটে না

যুগান্তর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ প্রকাশিত: ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১৩:৪৭

প্রকৃতি আমাদের উদার হস্তে নানা সম্পদ দান করেছে। পৃথিবীর সর্বত্রই প্রাকৃতিক সম্পদ ছড়িয়ে রয়েছে। প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত সম্পদ প্রাথমিক কাঁচামাল হিসাবে বিবেচিত হয়। এ কাঁচামালকে প্রযুক্তিগতভাবে রূপান্তর ও পরিমার্জনের মাধ্যমে ফিনিশ্ড প্রোডাক্ট বা চূড়ান্ত পণ্যে পরিণত করতে হয়। প্রকৃতি প্রদত্ত সম্পদ প্রাথমিক কাঁচামাল হিসাবে যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ এবং মূল্যবান হয়ে উঠতে পারে, যদি তাকে রূপান্তরের মাধ্যমে চূড়ান্ত পণ্যে রূপ দেওয়া যায়। প্রকৃতি প্রদত্ত সম্পদ জাতীয় অর্থনীতিতে যতটা মূল্য সংযোজন করতে পারে, তার চেয়ে অনেকগুণ বেশি মূল্য সংযোজন করতে পারে, যদি প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে তাকে ফিনিশ্ড প্রোডাক্টে পরিণত করা যায়।


শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ থাকলেই একটি দেশ উন্নতির শিখরে উঠতে পারে না, যদি সেই সম্পদ রূপান্তর এবং পরিমার্জনের মাধ্যমে উপযোগিতা বাড়ানোর মতো সক্ষমতা না থাকে। রূপান্তরের মাধ্যমে প্রাকৃতিক সম্পদের উপযোগিতা বৃদ্ধির মতো দক্ষতা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা না থাকলে প্রাকৃতিক সম্পদ বরং বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে। কারণ সামর্থ্যবান দেশগুলো তাদের অব্যবহৃত সেই সম্পদের প্রতি অতিমাত্রায় লোভের কারণে দ্বন্দ্ব-সংঘাত সৃষ্টি করে। অনেক দেশ আছে, যাদের মাটির নিচে প্রচুর খনিজসম্পদ আছে, কিন্তু সেই সম্পদ উত্তোলনের মতো প্রযুক্তিগত সামর্থ্য নেই বা অর্থ সংকুলান নেই। তারা বিদেশি কোনো কোম্পানিকে খনিজসম্পদ উত্তোলনের দায়িত্ব প্রদান করে; ফলে লাভের বড় অংশই বিদেশি কোম্পানি নিয়ে যায়।


সম্পদের মান নির্ভর করে তার চূড়ান্ত রূপান্তর বা ব্যবহারের ওপর। বনের একটি গাছ হয়তো ১০ হাজার টাকায় বিক্রি হতে পারে; কিন্তু সেই গাছটিকে যদি প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে মনোলোভা ফার্নিচার তৈরি করা হয়, তাহলে তার উপযোগিতা বহুগুণ বাড়বে। পাশাপাশি তার মূল্যও বেড়ে যাবে। হয়তো ১০ হাজার টাকার গাছটিকেই ফার্নিচারে রূপান্তর করে ৫ লাখ টাকায় বিক্রি করা সম্ভব হবে। খনিতে যে স্বর্ণ কাঁচা অবস্থায় থাকে, তার মূল্য অতি সামান্য। কিন্তু সেই স্বর্ণ খনি থেকে উত্তোলনের পর প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে গয়না তৈরি করা হলে তার মূল্য আর আগের মতো থাকে না। উৎপাদিত তুলা মাঠে থাকাবস্থায় অতি অল্পমূল্যে বিক্রি হয়। সেই তুলাই যখন প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে সুতা তৈরি করা হয়, তখন তার মূল্যমান অনেকটাই বৃদ্ধি পায়। অর্থাৎ প্রকৃতি প্রদত্ত প্রতিটি সম্পদের প্রাথমিক মূল্যের চেয়ে প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে ফিনিশ্ড প্রোডাক্ট তৈরি করা হলে তার মূল্যমান নিশ্চিতভাবেই অনেক বেড়ে যায়।


তবে প্রাকৃতিক সম্পদ প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে ফিনিশ্ড প্রোডাক্ট তৈরি করার সক্ষমতা সবার থাকে না। অনেক দেশ সম্পদহীনতার জন্য দরিদ্র, আবার কোনো কোনো দেশ সম্পদ থাকা সত্ত্বেও তার সর্বোত্তম সদ্ব্যবহার না করতে পারার জন্য দরিদ্র। একটি দেশ দরিদ্র হওয়ার জন্য প্রাকৃতিক সম্পদহীনতা যতটা না দায়ী, তার চেয়ে বেশি দায়ী প্রাকৃতিক সম্পদকে প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে তার উপযোগিতা বাড়ানোর দক্ষতা ও সক্ষমতার অভাব। যেসব দেশ প্রাকৃতিক সম্পদ কাঁচামাল হিসাবে রপ্তানি বা বিক্রি করে, তারা দাম পায় তুলনামূলকভাবে কম। আর যারা সেই সম্পদ ক্রয় করে প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে বিভিন্ন পণ্য তৈরি করে বাজারে বিক্রি করে বা রপ্তানি করে, তারা বহুগুণ বেশি মূল্য পায়। অনেক সময় এমনও ঘটে যে, একটি দেশ হয়তো কোনো সম্পদ কাঁচামাল হিসাবে অন্য দেশের কাছে বিক্রি করল, ক্রেতা দেশটি সেই কাঁচামাল দিয়ে উন্নতমানের বস্তু তৈরি করে সেই পণ্য কাঁচামাল রপ্তানিকারক দেশের কাছে বিক্রি করে। কাঁচামাল রপ্তানিকারক দেশটি যে পণ্য হয়তো ১ হাজার টাকায় বিক্রি করেছে, সেই কাঁচামাল দিয়ে তৈরি ফিনিশ্ড প্রোডাক্ট তাকে আবার ১০ হাজার টাকায় ক্রয় করতে হচ্ছে। অর্থনীতির পরিভাষায় একে কাঁচামালের অভিশাপ বা কম মূল্য সংযোজন নীতি বলা যেতে পারে।


একটি দেশ যদি তার প্রাকৃতিক সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে জাতীয় উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে চায়, তাহলে তাকে কিছু বাস্তবসম্মত কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। প্রথমেই তাদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়ানোর প্রতি জোর দিতে হবে। প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ এবং আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারের মাধ্যমে কাঁচামালের অপচয় কমানো সম্ভব। হস্তনির্মিত পণ্যের চেয়ে যান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় তৈরি পণ্যের উৎকর্ষ বেশি থাকে। পণ্যের গুণগত মান রক্ষা করা সম্ভব হয়। উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলকভাবে কম হয়।


তাই শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনসম্পদ গড়ে তুলতে হবে। একটি দেশের জন্য শ্রেষ্ঠ সম্পদ হচ্ছে আধুনিক ও প্রযুক্তিজ্ঞানসম্পন্ন জনশক্তি। অনেক সময় প্রচলিত ধ্যান-ধারণায় অপরিকল্পিত জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে ‘এক নম্বর জাতীয় সমস্যা’ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু জনসংখ্যা, তা পরিকল্পিতই হোক, আর অপরিকল্পিত, কখনোই এক নম্বর জাতীয় সমস্যা হতে পারে না। জনসংখ্যা একটি দেশের শ্রেষ্ঠ সম্পদ, যদি তাকে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে গড়ে তোলা যায়। জনসংখ্যা এমনই এক উপকরণ, যা ছাড়া কোনো উৎপাদনকার্য সম্পাদিত হতে পারে না। যে মেশিনে উন্নতমানের ফিনিশ্ড প্রোডাক্ট তৈরি হয়, তার পেছনেও একজন পরিশ্রমী দক্ষ মানুষের উপস্থিতি থাকে। জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। কাজেই কোনো দেশের জনসংখ্যাকে যদি জনসম্পদে পরিণত করা না যায়, সে ব্যর্থতার দায় জনসংখ্যার নয়, রাষ্ট্রের।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও