তাজমিনের হত্যা নিয়ে কতিপয় প্রশ্ন

www.ajkerpatrika.com ড. মো. শফিকুল ইসলাম প্রকাশিত: ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১৩:৪৫

একজন কিশোরীর মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড আমাদের সামনে নতুন করে তুলে ধরেছে পারিবারিক সম্পর্কের সংকট, কৈশোরের মানসিক জটিলতা, সামাজিক উদাসীনতার ব্যাপারগুলো। একজন কিশোরীকে হত্যা করা কেবল একটি পরিবারের সন্তান হারানোর ব্যাপার না, এটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাহীনতারও প্রশ্ন।


৮ অক্টোবর সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার ভোরালজগতপুর উত্তরপাড়ার একটি ধানখেতের আইল থেকে সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী জান্নাতুল তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তাকে মর্মান্তিকভাবে হত্যা করা হয়। এ ধরনের ঘটনার আবেগঘন প্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং দায়িত্ব নির্ধারণের ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া।


যেকোনো শিশুর জন্য প্রথম বিদ্যালয় তার পরিবার এবং প্রথম শিক্ষক মা-বাবা। পরিবার থেকেই শিশুর ভালোবাসা, বিশ্বাস, নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ ও নিরাপত্তার শিক্ষা পাওয়ার কথা। কিন্তু বর্তমানে অধিকাংশ অভিভাবকের সঙ্গে সন্তানদের সম্পর্ক আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়েছে। সন্তান কী খাচ্ছে, কী পড়ছে, কিংবা পরীক্ষায় কত নম্বর পাচ্ছে—এসব বিষয়ে তাঁরা যতটা সচেতন, এর বাইরে সন্তানের মনের অবস্থা বোঝার প্রয়োজন তাঁদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ নয়।

তাজমিনকে হত্যার ঘটনায় অন্যতম প্রশ্ন হলো, একটি কিশোরী দীর্ঘ সময় ধরে পরিবারের নজরের বাইরে থাকলে অভিভাবকেরা কী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন? থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছিল কি না, পুলিশকে কখন জানানো হয়েছিল এবং অনুসন্ধানের জন্য কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল—এসব প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর প্রয়োজন।


কৈশোর মানুষের জীবনের অত্যন্ত সংবেদনশীল সময়। এই বয়সে আবেগ, কৌতূহল, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা এবং নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠার চেষ্টা প্রবল হয়ে ওঠে। কিন্তু আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং বিপদের মুখোমুখি হওয়ার পর করণীয় সম্পর্কে তারা স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে পারে না এ বয়সে। এ কারণে এই সময়ের বিপদগুলো সম্পর্কে পরিবার ও স্কুল থেকে পাঠ দেওয়া জরুরি।


অনেক মা-বাবা মনে করেন, কঠোর শাসনের মাধ্যমেই সন্তানকে সঠিক পথে রাখা সম্ভব। অথচ অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ, অপমান, ভয় দেখানো কিংবা সন্তানের মতামতকে গুরুত্ব না দেওয়া কখনো কখনো তার মধ্যে গোপনীয়তা ও দূরত্ব সৃষ্টি করতে পারে। আবার সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণহীন স্বাধীনতাও ঝুঁকিপূর্ণ। প্রয়োজন ভালোবাসা ও শৃঙ্খলার সমন্বয়। সন্তান যেন বুঝতে পারে, ভুল করলেও তার ফিরে আসার সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় মা-বাবাই।


আলোচিত ঘটনায় একটি স্বল্প সময়ের প্রেমের সম্পর্ক, হোটেলে অবস্থান এবং পরবর্তী যাতায়াতের যে বিবরণ সামনে এসেছে, সেগুলো সত্য হলে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। হোটেলে অপ্রাপ্তবয়স্ক অতিথির পরিচয় যাচাই করা হয়েছিল কি না, প্রচলিত নিবন্ধন ও নিরাপত্তাবিধি অনুসরণ করা হয়েছিল কি না এবং কোনো প্রতারণার ঘটনা ঘটেছিল কি না—এসব বিষয় তদন্তকারীদের খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে আমাদের মনে রাখতে হবে, কৈশোরের আবেগ বা ভুল সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই একটি শিশুর বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধকে বৈধতা দেয় না। অপরাধের দায় অপরাধীরই। শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রাপ্তবয়স্কদের এবং রাষ্ট্রের দায়িত্ব।


অভিযুক্ত সিএনজিচালকের অতীত আচরণ, মাদকাসক্তির অভিযোগ এবং স্থানীয় মানুষের প্রতিক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠিত হওয়া প্রয়োজন। মাদকাসক্তি কিংবা অস্বাভাবিক আচরণ করলেই কেউ অপরাধী হয়ে যায় না। কিন্তু কারও বিরুদ্ধে হয়রানি, সহিংসতা বা অপরাধের বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ থাকলে তা উপেক্ষা করা সমাজের দায়িত্বহীনতার পরিচয়। আমরা অনেক সময় বিপথগামী মানুষকে নিয়ে ভিডিও তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিই। অথচ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা, পুনর্বাসন কিংবা আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে সচেতন হই না। একটি সভ্য সমাজের দায়িত্ব কেবল অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর প্রতিবাদ করা নয়, অপরাধের ঝুঁকি চিহ্নিত করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা।


এ ধরনের ঘটনায় অনেকে মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে এককভাবে দায়ী করছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি কোনোভাবেই সঠিক না। প্রযুক্তির খারাপ দিক বাদ দিয়ে এর ভালো দিকগুলো থেকে শিক্ষা নেওয়ার পাঠ শিক্ষকদের দিতে হবে। আবার অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের প্রযুক্তি থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রাখার পরিবর্তে বয়সোপযোগী ও দায়িত্বশীল ব্যবহারের শিক্ষা দেওয়া। তবে অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ, ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ, অনলাইন প্রতারণা এবং গোপন সাক্ষাতের ঝুঁকি সম্পর্কে তাদের সচেতন করতে হবে। মা-বাবাকে সন্তানের ডিজিটাল জীবনের অংশ হতে হবে, গোপনে নজরদারি করে নয়, বিশ্বাস ও বয়সোপযোগী তত্ত্বাবধানের মাধ্যমে। বাংলাদেশের শিশু আইন, ২০১৩ শিশুদের অধিকার ও সুরক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ আইনিকাঠামো। কিন্তু আইন থাকার পাশাপাশি তার কার্যকর প্রয়োগ অপরিহার্য।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও