জ্বালানি তেলের বেসরকারীকরণের ঝুঁকি
বাংলাদেশের জ্বালানিবাজার একটি বড় পরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে। দীর্ঘদিন ধরে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি, মজুত, বিতরণ ও বিপণনে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে আসছে। এখন সেই বাজারে ব্যক্তি খাতকে আরও বড় পরিসরে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। বসুন্ধরা সরাসরি পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণনের প্রস্তাব দিয়েছে।
নীতিমালা তৈরি হচ্ছে। বসুন্ধরার প্রস্তাবটি তাই কেবল একটি কোম্পানির ব্যবসায়িক উদ্যোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি বাংলাদেশের জ্বালানিবাজারের কাঠামো, রাষ্ট্রের ভূমিকা, প্রতিযোগিতা, ভোক্তার অধিকার এবং জাতীয় জ্বালানিনিরাপত্তা—সবকিছুর সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বড় নীতিগত প্রশ্ন।
জ্বালানি তেল আমদানিতে ব্যক্তি খাত প্রবেশের পক্ষে বলা হয় প্রতিযোগিতা বাড়বে; তাই আমদানি দক্ষতা বাড়বে, বন্দর ও সংরক্ষণ অবকাঠামোর ব্যবহার উন্নত হবে, নতুন বিনিয়োগ আসবে এবং সরকারের আর্থিক চাপ কমবে।
বর্তমানে বিপিসি দেশের জ্বালানিনিরাপত্তার জন্য অপরিশোধিত ও পরিশোধিত তেল আমদানি, নিরাপদ মজুত এবং নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের দায়িত্ব পালন করে। পরিশোধিত জ্বালানি তেলের মোট চাহিদার একটি অংশ জি-টু-জি চুক্তি এবং অবশিষ্ট অংশ আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে আমদানি করা হয়।
আমদানি ও বিতরণে ব্যক্তি খাতের প্রবেশ প্রকৃত প্রতিযোগিতা তৈরিতে সক্ষম হলে অর্থনৈতিক সুফল আসতে পারে। কিন্তু এখানেই একটি মৌলিক প্রশ্ন, বেসরকারীকরণ কি স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করে? উত্তর, না।
জ্বালানি তেল আমদানি কোনো সাধারণ ব্যবসা নয়। এ ব্যবসায় বিপুল মূলধন, আমদানি অর্থায়ন, বৈদেশিক মুদ্রা, ধারণক্ষমতা, ডিপো, পরিবহন, বিতরণ অবকাঠামো এবং ফিলিং স্টেশন প্রয়োজন। ফলে বাজারে প্রবেশের বাধা স্বাভাবিকভাবেই বেশি। এ অবস্থায় রাষ্ট্রীয় একচেটিয়া ব্যবস্থা ভেঙে যদি অল্প কয়েকটি বড় কোম্পানির হাতে আমদানি, মজুত ও বিপণনের নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীভূত হয়, তাহলে প্রতিযোগিতার বদলে প্রাইভেট অলিগোপলি তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে এবং অলিগার্ক শ্রেণির উত্থান হয়।
বসুন্ধরা বছরে ১৫–২০ লাখ টন ডিজেল, ২ লাখ টন অকটেন, ১ দশমিক ৫ লাখ টন পেট্রল এবং ৮–১০ লাখ টন ফার্নেস অয়েল আমদানির প্রস্তাব করেছে। এসব পরিমাণ দেশের মোট বার্ষিক জ্বালানি তেলের চাহিদার একটি বড় অংশের সমান। এখানে প্রশ্নটি ব্যক্তি বা কোনো কোম্পানির বিরুদ্ধে নয়; প্রশ্নটি হলো, বাজার কেন্দ্রীভবন।
একটি কৌশলগত পণ্যের বাজারে কোনো একক প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসায়ী গ্রুপ যদি আমদানি, মজুত, বিতরণ ও খুচরা বিপণন নেটওয়ার্কের উল্লেখযোগ্য অংশ নিয়ন্ত্রণ করে, তাহলে রাষ্ট্রীয় মনোপলি ভেঙে একটি নতুন ধরনের ব্যক্তি বা গোষ্ঠীনিয়ন্ত্রিত বাজারক্ষমতা সৃষ্টির আশঙ্কা থাকে। এ ক্ষেত্রে এলপিজির বাজার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
এলপিজি বাজারের অভিজ্ঞতা
ওই আশঙ্কাকে গুরুত্ব দেওয়ার আরেকটি কারণ বাংলাদেশের এলপিজি বাজারের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা। বিইআরসি নির্ধারিত মূল্য থাকলেও বিভিন্ন সময়ে বাজারে তার চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। ২০২৬ সালের মার্চে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের নির্ধারিত মূল্য ছিল ১ হাজার ৩৪১ টাকা; অথচ একই সময়ে বিভিন্ন বাজারে এর চেয়ে বেশি দামে তা বিক্রি হয়।
অতঃপর কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে অতিরিক্ত দামে এলপিজি বিক্রির অভিযোগ তদন্তের
জন্য সরকার নির্দেশ দেয়। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, দেশে সামগ্রিক এলপিজি সরবরাহে ঘাটতি নেই।
এই অভিজ্ঞতা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে, নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান থাকলেই কি বাজার নিয়ন্ত্রিত হয়? উত্তর যদি না হয়, তাহলে আরও বড় এবং আরও কৌশলগত জ্বালানিবাজারে ব্যক্তি খাত আনার আগে রেগুলেটরি ক্যাপাসিটি শক্তিশালী করা জরুরি। অথচ তা মোটেও গুরুত্ব পাচ্ছে না।
- ট্যাগ:
- মতামত
- জ্বালানি তেল
- বেসরকারিকরণ