কৃষণ চন্দর, ঘৃণা ও দুধকলা দিয়ে পোষা কালসাপ
বাংলাদেশ তার জন্মযন্ত্রণা নিয়ে আশপাশের দেশগুলো থেকে কেন আলাদা, তার ইতিহাস সবাই জানে। তারপরও তা থেকে যে কোনো শিক্ষা নেওয়া হয়নি, সেটা বোঝা যায় বর্তমান সময়ে কিছু মানুষের কিছু মনোভঙ্গি দেখলে। পাশেই তো ভারত, সে দেশ পার হলে পাকিস্তান। কিন্তু এই দুটি দেশের জন্ম হয়েছিল ব্রিটিশদের সঙ্গে সমঝোতা করে। ভারতবর্ষ ছিল যেন একটা পাউরুটি। সেই পাউরুটি ইংরেজদের হাতে তুলে দিয়ে যেন বলা হলো, ভাগ করে দিন। তারাও তাদের মতো করে দুটি দেশ সৃষ্টি করল। মুসলিম লীগের লাহোর প্রস্তাবে ভারতবর্ষের পূর্বাঞ্চলে বাংলা ও আসাম নিয়ে আরেকটি স্বাধীন রাষ্ট্র গড়ে তোলার যে কথা ছিল, সেটা সে সময়ের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রবল তাড়নায় উবে গেল।
একদল রাজনীতিবিদ সাম্প্রদায়িক প্রশ্নটিকে রাজনীতির সবচেয়ে বড় প্রশ্নে পরিণত করে হিন্দুর জন্য হিন্দুস্তান আর মুসলিমদের জন্য পাকিস্তান তৈরি করল। তত দিনে বিশ্ব রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর বিদায়ঘণ্টা বেজে উঠেছিল। তারা চাইলেও ভারতবর্ষের লাগাম আর তাদের হাতে রাখতে পারত না। দু-দুটো বিশ্বযুদ্ধের কারণে ইউরোপে মানুষে-মানুষে অবিশ্বাস যেমন বেড়েছিল, তেমনি বাকি দুনিয়ার হালচালও পাল্টে গিয়েছিল। উপনিবেশগুলোয় ইউরোপীয় প্রভু-শাসনের বিরুদ্ধে যে গণজাগরণ তৈরি হয়েছিল, তা সামাল দেওয়ার ক্ষমতা ব্রিটেন, ফ্রান্স, পর্তুগাল, স্পেনের আর ছিল না। ষাটের দশকে একে একে এক-একটি দেশ পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে বেরিয়ে আসতে থাকে। ভারতবর্ষে বসবাসকারী দুই বৃহৎ সম্প্রদায়কে পরস্পরের মুখোমুখি করে তোলার ক্ষেত্রে ব্রিটিশরা সফল হয়েছে, কিন্তু যে প্রশ্নটি এড়ানো যাবে না, তা হলো, এই দুই সম্প্রদায়ের শ্রেষ্ঠ নেতারা কীভাবে ব্রিটিশদের ফাঁদে পড়লেন এবং তড়িঘড়ি করে ধর্মের ভিত্তিতে নিজেরা ভাগ হয়ে গেলেন?
গত শতাব্দীর সেই চল্লিশ দশকের রাজনৈতিক আবহাওয়া যেভাবে তেতে উঠেছিল, তাতে হিন্দু-মুসলমান এই দুই সম্প্রদায়ের মানুষের মনে পরস্পরের প্রতি ঘৃণাই বড় হয়ে উঠেছিল। যাঁরা ‘শান্তির ললিত বাণী’র ওপর আস্থা রাখতেন, তাঁদের কথার মূল্য তখন আর ছিল না। তখন শুধু ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ হওয়ার উন্মাদনাই গ্রাস করেছিল অন্য সবকিছু। কোনো সন্দেহ নেই, বাংলার মুসলমানেরা মুসলিমদের জন্য একটি দেশ লাভের জন্য উদ্গ্রীব হয়ে উঠেছিল। শুধু ধর্মের কারণেই মুসলিমরা এই দেশ চায়নি। তাদের নিজেদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তনের যে আকাঙ্ক্ষা ছিল, তার বাস্তব রূপ দেওয়ার তাড়নাই তাদের মূলত একটি ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রের প্রতি আগ্রহী করে তুলেছিল। কিন্তু সেই তাড়না যে বিষবৃক্ষের জন্ম দিয়েছিল, তার জের আমরা এখনো বহন করে চলেছি। ১৯৪৭ সালে যে ধোঁকার সম্মুখীন হয়েছিল, সে কথা বাঙালি বুঝেছে আটচল্লিশ, বায়ান্ন, আটান্ন, বাষট্টি, পঁয়ষট্টি, উনসত্তর আর সত্তরে ধাক্কা খেতে খেতে। আন্দোলনের এই সময়টায় যে বাঙালিকে দেখা গেছে, সে বাঙালি ছিল অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি অসাম্প্রদায়িক, অনেক বেশি মানবিক, অনেক বেশি বীরোচিত। ধর্ম যার যার, দেশ সবার—এই শুভবাণীর ওপর নির্ভর করেই সে সময়ের মানুষের মানস গড়ে উঠেছিল। কিন্তু ধর্ম নিয়ে রাজনীতির নামে ধর্ম ব্যবসা করা বাঙালির আরেকটি অংশ বেড়ে উঠেছিল এই সময়টিতে, যারা অন্য ধর্মকে ঘৃণা করে, যারা দেশের জন্ম ইতিহাস পাল্টে দিতে চায়, যারা স্বাধীন বাংলাদেশে ‘পেয়ারা পাকিস্তান’-এর স্বপ্ন দেখে।
২. ইদানীং এ রকম কিছু আলামত দেখা গেছে বলেই কথাগুলো তুলতে হলো। পাকিস্তানের মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে যেভাবে উপস্থাপন করল কেউ কেউ, তাতে স্পষ্ট বোঝা যায়, এই অঞ্চলের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে তাদের বিন্দুমাত্র ধারণা নেই। ধর্ম-ব্যবসায়ী একটি শ্রেণি, যারা স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্ব মেনে নিতে চায়নি, তারাই পাকিস্তানের প্রসঙ্গ তুলে ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’ ধরনের পুলক অনুভব করেন এবং সেই বিষ ছড়িয়ে দেন এমন একদল তরুণের মনে, যারা যুক্তিবোধকে জলাঞ্জলি দিয়ে ঘৃণাকে মনে লালন করে আগ্রাসী অবস্থান নেয়। এই তো, বেশ কয়েক দিন ধরে ফেসবুকে জিন্নাহর সপক্ষে যেসব কথা শোনা গেল, সেগুলো যদি ধরে ধরে ব্যাখ্যা করা হয়, তাহলে সেই যৌক্তিক ব্যাখ্যা বোঝার মতো তাদের সামর্থ্য আছে বলেও মনে হয় না।
চল্লিশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে জিন্নাহ হয়ে উঠেছিলেন পুরো ভারতবর্ষের মুসলমানদের অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতা। সে সময় থেকে পাকিস্তানের জন্ম অবধি জিন্নাহকে মাথায় করে নেচেছে বাঙালি। সে সময়ের রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, সাহিত্যিকদের মধ্যেও জিন্নাহ-বন্দনা ছিল মুখ্য। সেটাই ছিল স্বাভাবিক। আন্তরিকভাবেই তাঁরা তাঁদের নতুন যুগ-প্রবক্তাকে শ্রদ্ধা করেছেন। কিন্তু তাঁর ভুলগুলোকেও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও জিন্নাহর ব্যাপারে শ্রদ্ধা রেখেই কথা বলেছেন। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে তার প্রমাণ আছে। সে কথা ফেসবুকসহ নানা যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই উচ্চারণ করে তৃপ্তি পান। কিন্তু কোনো কোনো বিষয় গোপন করে যান।
বঙ্গবন্ধু জিন্নাহর মূল্যায়ন করতে গিয়ে কেজি মুস্তাফাকে দেওয়া এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমি জানতাম। আমি জিন্নাহ সাহেবকে জেনেছিলাম।...জিন্নাহ সাহেব যখন ভারতবর্ষের বিভক্তি মেনে নিয়েছিলেন, আমার মনে আছে সে যুগে একমাত্র বাংলাদেশেই মুসলিম লীগের সরকার ছিল। কিন্তু তিনি কেবিনেট মিশনের সাথে আলোচনার সময় বাংলাদেশ থেকে কোনো প্রতিনিধি নেননি। তিনি সাথে নিয়েছিলেন লিয়াকত আলী খান আর সরদার আব্দুর রব নিশতারকে। বাংলার কোনো প্রতিনিধি তার সাথে যেতে পারেন নাই। তখনই আমরা বুঝতে পেরেছিলাম, জিন্নাহ সাহেব যত কথাই বলুন না কেন, তিনি বাংলা সম্পর্কে উদ্বিগ্ন নন। আরেকটি ব্যাপার ছিল, আমরা সে সম্পর্কেও মনে মনে চিন্তা করতাম। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষে বাংলাদেশে যখন ৩০ লক্ষ লোক মারা যায়, তখন জিন্নাহ সাহেব এক দিনের জন্য বাংলাদেশের মানুষকে দেখতে আসেন নাই। সেজন্যই আমরা বুঝতে পেরেছিলাম, জিন্নাহ সাহেবের মনের অবস্থা কী। পশ্চিম পাকিস্তানে তিনি যা পেয়েছেন, তা নিয়েই তিনি খুশি ছিলেন। বাংলাদেশকে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের একটি কলোনি এবং তার বোম্বের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের এবং পশ্চিম পাকিস্তানের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের বাজার হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। এসব আমার ভালো লাগেনি। আমি সব জানতাম, তাদের সাথে আমি আপস করতে পারব না, তখন তার অর্থাৎ জিন্নাহর সাথে দেখা করার দরকার আমি মনে করিনি।’
- ট্যাগ:
- মতামত
- সাম্প্রদায়িক রাজনীতি