পাকিস্তানে সামরিক নেতৃত্বের সামনে মসৃণ পথ নেই
পাকিস্তানের গভীর রাজনৈতিক সংকট নতুন মোড় নিয়েছে। ১১ অক্টোবর ফেডারেল সরকার দেশটির অস্থিরতাপূর্ণ প্রদেশ খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা ও গভর্নরের শাসন জারির ঘোষণা দিয়েছে। এই আদেশের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকার শুধু পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) নেতৃত্বাধীন প্রাদেশিক সরকারকেই সরিয়ে দেয়নি, একই সঙ্গে প্রদেশটির ১২টি জেলার প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণও প্রাদেশিক সরকারের হাত থেকে নিজেদের হাতে নিয়েছে।
পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় এই প্রদেশ সম্পর্কে তিনটি বিষয় মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, ১৯৮০ সাল থেকে পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে আফগানিস্তানে পশ্চিমা দেশগুলোর যুদ্ধ পরিচালনার ঘাঁটি হিসেবে খাইবার পাখতুনখাওয়াকে ব্যবহার করা হয়েছে। সে সময় প্রদেশটি যুদ্ধের ‘সম্মুখসারির অংশীদার’ হিসেবে পাকিস্তানের ভূমিকার অংশ ছিল। তিন দশকের বেশি সময় ধরে প্রদেশটি সন্ত্রাসবাদের ভয়াবহ সমস্যায় জর্জরিত।
দ্বিতীয়ত, চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর বা সিপিইসির (সিপেক) জন্য খাইবার পাখতুনখাওয়ার গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। পাকিস্তান ও চীনকে সংযুক্তকারী কারাকোরাম মহাসড়কটি এই প্রদেশের হাজারা বিভাগের মধ্য দিয়ে গেছে। অন্যদিকে সিপিইসির পশ্চিমাঞ্চলীয় পথটি প্রদেশটির ডেরা ইসমাইল খান বিভাগের মধ্য দিয়ে বেলুচিস্তানের গোয়াদর বন্দরের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
তৃতীয়ত, ২০১৩ সাল থেকে টানা তিন মেয়াদে এই প্রদেশের শাসনক্ষমতায় রয়েছে পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)। দলটির প্রতিষ্ঠাতা ও নেতা ইমরান খান পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও ক্রিকেট তারকা। দুর্নীতির অভিযোগে দায়ের করা মামলাগুলোয় দণ্ডিত হওয়ার পর প্রায় তিন বছর ধরে তিনি কারাগারে।
২০১৩ সালের সাধারণ নির্বাচনে সামরিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সমর্থন নিয়ে ইমরান খানের দল খাইবার পাখতুনখাওয়ায় সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়ী হয়। প্রদেশটিতে পশতুন জাতীয়তাবাদীদের বিকল্প শক্তি হিসেবে পিটিআইকে প্রতিষ্ঠা করাই ছিল সামরিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর উদ্দেশ্য।
২০১৮ সালের সাধারণ নির্বাচনে ইমরানের দল শুধু খাইবার পাখতুনখাওয়ায় নয়, পাঞ্জাব প্রদেশেও জয়লাভ করে। এর ফলে দলটি কেন্দ্রীয় সরকার গঠনের সুযোগ পায়। তবে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়ার প্রায় প্রকাশ্য সমর্থন ছাড়া পিটিআইয়ের পক্ষে এই ক্ষমতায় আসা সম্ভব হতো না।
প্রকৃতপক্ষে, সেনা জেনারেলরা মুসলিম লীগ নেতা নওয়াজ শরিফকে ক্ষমতা থেকে সরাতে চেয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে সংবিধান বাতিলের অভিযোগে সাবেক সামরিক শাসক জেনারেল পারভেজ মোশাররফের বিরুদ্ধে একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করেছিলেন নওয়াজ শরিফ। এ কারণে সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে তাঁর বিরোধ তৈরি হয়েছিল।
কিন্তু এক দশক ধরে ‘পুরোনো রাজনীতিকদের’ পেছনে ঠেলে দিতে সেনাবাহিনীর পছন্দের নেতা হিসেবে ব্যবহৃত ইমরান খান ২০২২ সালে জেনারেলদের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন। সেনাবাহিনীতে পদায়ন, বদলি ও পদোন্নতির প্রশ্নে এই বিরোধ তৈরি হয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিরোধী দলগুলোর অনাস্থা ভোটে ক্ষমতাচ্যুত হন ইমরান। ফলে জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়ার অবসরের পর তাঁর ঘনিষ্ঠ মিত্র জেনারেল ফয়েজ হামিদকে সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ দিতে পারেননি ইমরান খান। এই পরিস্থিতিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ জেনারেল আসিম মুনিরকে সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ পদে নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ পান।
- ট্যাগ:
- মতামত
- রাজনৈতিক সংকট
- সামরিক শাসন