শিক্ষকতার পেশা কেন আর মেধাবীদের আকর্ষণ করে না?
একজন শিশুর জীবনে প্রথম যে মানুষটি বাবা-মায়ের বাইরে সবচেয়ে গভীর প্রভাব বিস্তার করেন, তিনি শিক্ষক। একজন চিকিৎসক মানুষের জীবন বাঁচান, একজন প্রকৌশলী সেতু নির্মাণ করেন, একজন বিচারক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করেন, একজন প্রশাসক রাষ্ট্র পরিচালনা করেন। কিন্তু তাঁদের প্রত্যেকের পেছনেই থাকেন একজন শিক্ষক। তাই পৃথিবীর প্রায় সব উন্নত দেশেই শিক্ষকতাকে কেবল একটি পেশা হিসেবে নয়, জাতি গঠনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশে এই পেশার সামাজিক মর্যাদা এখনও মুখে যতটা উচ্চারিত হয়, বাস্তবে তার প্রতিফলন ততটা দেখা যায় না। ফলাফলও চোখের সামনে। দেশের সবচেয়ে মেধাবী তরুণদের বড় অংশ এখন শিক্ষকতা নয়, অন্য পেশায় নিজেদের ভবিষ্যৎ খুঁজছেন।
এটি কেবল একটি পেশাগত সংকট নয়; এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের বিষয়। কয়েক দশক আগেও বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাতালিকায় শীর্ষস্থান অধিকারী অনেক শিক্ষার্থী শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক মর্যাদা, সামাজিক সম্মান এবং আত্মতৃপ্তির এক অনন্য সমন্বয়। আজ সেই দৃশ্য বদলে গেছে। তথ্যপ্রযুক্তি, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, উন্নয়ন সংস্থা, বিসিএস, বিদেশে উচ্চশিক্ষা কিংবা আন্তর্জাতিক চাকরির বাজার—এসবই এখন মেধাবীদের প্রধান গন্তব্য। শিক্ষকতা অনেক ক্ষেত্রেই পরিণত হয়েছে বিকল্প পেশায়। এর কারণ কেবল অর্থ নয়; এর পেছনে রয়েছে নীতিগত, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক নানা বাস্তবতা।
ইউনেস্কোর Global Education Monitoring Report এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (ওইসিডি)-এর বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, যেসব দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা বিশ্বে সবচেয়ে সফল, সেসব দেশে শিক্ষক নির্বাচন অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক এবং শিক্ষকতার সামাজিক মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ। ফিনল্যান্ডে শিক্ষক হওয়ার সুযোগ পান মাত্র অল্পসংখ্যক আবেদনকারী। সেখানে শিক্ষক নিয়োগে একাডেমিক ফলাফলের পাশাপাশি নেতৃত্ব, গবেষণার আগ্রহ, সৃজনশীলতা এবং শিশু মনোবিজ্ঞান সম্পর্কে ধারণাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়। সিঙ্গাপুরে শিক্ষক হওয়ার আগেই নির্বাচিত শিক্ষার্থীরা সরকারি বৃত্তি ও প্রশিক্ষণ ভাতা পান। দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতা দেশের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ সরকারি পেশা হিসেবে বিবেচিত হয়।
এই দেশগুলো বুঝেছে, একজন ভালো শিক্ষক মানে ভবিষ্যতের একজন দক্ষ চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, উদ্যোক্তা কিংবা রাষ্ট্রনায়ক তৈরির ভিত্তি।
বাংলাদেশেও শিক্ষা নিয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষার অভাব নেই। স্বাধীনতার পর থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে, শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে, উচ্চশিক্ষার সুযোগও বিস্তৃত হয়েছে। কিন্তু শিক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান—যোগ্য শিক্ষক—তৈরি ও ধরে রাখার ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি।
বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন বিশ্লেষণে বারবার বলা হয়েছে, শিক্ষা খাতে বিনিয়োগের প্রকৃত ফল নির্ভর করে শিক্ষকের গুণগত মানের ওপর। অথচ বাংলাদেশে শিক্ষাখাতে সরকারি ব্যয় এখনও মোট দেশজ উৎপাদনের তুলনায় দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের চেয়ে কম। দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষাবিদেরা জিডিপির অন্তত ৪ থেকে ৬ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দের কথা বলছেন, কিন্তু বাস্তব বরাদ্দ সেই লক্ষ্যের অনেক নিচে।
শিক্ষকতার আকর্ষণ কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ অর্থনৈতিক বাস্তবতা। একজন মেধাবী শিক্ষার্থী যখন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হন, তখন তিনি দেখেন একই যোগ্যতায় অন্য পেশায় দ্রুত ক্যারিয়ার গড়া, তুলনামূলক বেশি আয়, আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ এবং উন্নত কর্মপরিবেশের সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে শিক্ষকতায় প্রবেশের প্রক্রিয়া দীর্ঘ, পদোন্নতির গতি ধীর, গবেষণার সুযোগ সীমিত এবং প্রশাসনিক জটিলতা অনেক বেশি।
তবে বিষয়টি কেবল বেতনের নয়। মর্যাদাও একটি বড় বিষয়। সমাজ যখন সাফল্যের প্রধান সূচক হিসেবে অর্থ ও ভোগকে প্রতিষ্ঠিত করে, তখন জ্ঞানচর্চার পেশাগুলো ধীরে ধীরে মূল্য হারায়। একসময় শিক্ষককে দেখে মানুষ দাঁড়িয়ে সম্মান জানাত। এখন সেই সামাজিক সংস্কৃতিও অনেকটাই ক্ষয়প্রাপ্ত। অনেক পরিবারেই সন্তানকে শিক্ষক হওয়ার পরামর্শ না দিয়ে বলা হয়—'আরও ভালো কিছু করার চেষ্টা করো।' এই 'ভালো কিছু' কথাটিই আমাদের সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রতীক।
গবেষণার পরিবেশও শিক্ষকতার আকর্ষণ কমিয়ে দিয়েছে। বিশ্বের প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক মানেই গবেষক। নতুন জ্ঞান সৃষ্টি, উদ্ভাবন, নীতিনির্ধারণে অংশগ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা তাঁদের কাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলাদেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনও গবেষণা তহবিল সীমিত, আধুনিক গবেষণাগারের অভাব রয়েছে, আন্তর্জাতিক মানের প্রকাশনার জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা অপ্রতুল। ফলে অনেক তরুণ গবেষক বিদেশে চলে যান এবং সেখানেই স্থায়ী হয়ে যান। মেধাপাচারের এই প্রবণতা দেশের উচ্চশিক্ষাকে দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল করে দিচ্ছে।