বেকারত্বের আতঙ্ক : তরুণসমাজ কোন পথে?

কালের কণ্ঠ ড. হারুন রশীদ প্রকাশিত: ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ১০:১১

সকালবেলা একটি চাকরির পরীক্ষাকেন্দ্রের সামনে দাঁড়ালে বাংলাদেশের তরুণসমাজের একটি অদৃশ্য ছবি দেখা যায়। হাতে ফাইল, কাঁধে ব্যাগ, চোখে অনিশ্চয়তা—হাজার হাজার তরুণ একটি পদের জন্য অপেক্ষা করছেন।

কারো বয়স ২৫, কারো ২৮, কারো ৩০ পেরিয়েছে। কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়েছেন, কেউ একাধিক প্রশিক্ষণ করেছেন, কেউ বছরের পর বছর বিসিএস, ব্যাংক, শিক্ষক নিবন্ধন কিংবা বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। একটি চাকরি যেন শুধু একটি চাকরি নয়, সেটিই তাঁদের কাছে আত্মমর্যাদা, সামাজিক স্বীকৃতি, পরিবারের প্রত্যাশা এবং ভবিষ্যতের নিরাপত্তার দরজা।


কিন্তু সেই দরজা খুলছে কতজনের জন্য? বাংলাদেশে বেকারত্বের সামগ্রিক হার তুলনামূলকভাবে কম দেখায়—বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের আইএলওভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী মোট বেকারত্বের হার ৩.৮ শতাংশ।

কিন্তু এই সংখ্যা দিয়ে তরুণদের বাস্তবতা বোঝা যায় না। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে তরুণদের বেকারত্বের হার ১৬.৮ শতাংশ; তরুণীদের ক্ষেত্রে তা ২২.৭ শতাংশ। আরো উদ্বেগজনক হলো, ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের ৩০.৯ শতাংশ কর্মসংস্থান, শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ—কোনোটিতেই নেই। তরুণীদের ক্ষেত্রে এই হার ৪৯.৩ শতাংশ।


এই পরিসংখ্যানের পেছনে যে জীবনগুলো রয়েছে, সেগুলো শুধু অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান নয়। সেখানে আছে অপেক্ষা, হতাশা, পরিবারের চাপ, আত্মবিশ্বাসের ক্ষয় এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয়।


আরেকটি তথ্য সমস্যাটিকে আরো পরিষ্কার করে। বিশ্বব্যাংক বলছে, ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বাংলাদেশে এক কোটি ৪০ লাখ তরুণ কর্মক্ষম বয়সে প্রবেশ করলেও চাকরি তৈরি হয়েছে মাত্র ৮৭ লাখ। একই সময়ে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান বাড়ার বদলে অনেক তরুণ কম উৎপাদনশীল খাতে ঢুকেছেন।


এখানেই বাংলাদেশের তথাকথিত ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’-এর আসল পরীক্ষা।


বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একজন তরুণ বের হচ্ছেন একটি ডিগ্রি নিয়ে, আর চাকরির বাজার তাঁকে খুঁজছে অন্য ধরনের দক্ষতা নিয়ে। নিয়োগদাতার প্রয়োজন যোগাযোগ দক্ষতা, ইংরেজি, তথ্য-প্রযুক্তি, সমস্যা সমাধান, দলগত কাজ, ডেটা বিশ্লেষণ, কারিগরি সক্ষমতা কিংবা শিল্পভিত্তিক বিশেষায়িত জ্ঞান। ফলে একই সঙ্গে দুটি সংকট তৈরি হচ্ছে—শিক্ষিত বেকারত্ব এবং দক্ষ জনবলের ঘাটতি।


এই বৈপরীত্য অস্বাভাবিক মনে হলেও বাস্তবে এটি খুবই পরিচিত সমস্যা। বিশ্বব্যাংকের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের অধিভুক্ত কলেজ থেকে স্নাতক হওয়ার প্রায় তিন বছর পরও প্রায় ৪৬ শতাংশ গ্র্যাজুয়েট বেকার ছিলেন। তাহলে প্রশ্ন হলো, এত বছর পড়াশোনার পরও একজন তরুণ কেন কর্মসংস্থানের উপযোগী হয়ে উঠছেন না? এর উত্তর শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে নেই। দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোও এর জন্য দায়ী। বাংলাদেশের কর্মসংস্থানের প্রায় ৮৫ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে—বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী। এই খাতে কাজের নিরাপত্তা কম, মজুরি তুলনামূলকভাবে কম এবং উৎপাদনশীলতাও কম। অর্থাৎ তরুণদের সামনে দুটি বিপরীত বাস্তবতা। একদিকে তাঁরা উচ্চশিক্ষা নিয়ে ‘ভালো চাকরি’র প্রত্যাশা করছেন; অন্যদিকে অর্থনীতি পর্যাপ্ত সংখ্যায় সেই মানসম্মত চাকরি তৈরি করতে পারছে না। ফলে চাকরির বাজারে একটি অদ্ভুত মানসিকতা তৈরি হয়েছে। তরুণের কাছে চাকরি মানে অনেক সময় শুধু আয় নয়, ‘সম্মানজনক’ চাকরি।


রপ্তানি খাতকে বৈচিত্র্যময় করা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে শক্তিশালী করা, কৃষি-প্রক্রিয়াজাত শিল্প, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, চামড়া, ওষুধ, তথ্য-প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, পর্যটন, লজিস্টিকস ও কেয়ার ইকোনমির মতো খাতে বড় বিনিয়োগের প্রয়োজন। ঢাকাকেন্দ্রিক কর্মসংস্থানও ভাঙতে হবে।  তরুণীদের বিষয়টি আলাদা গুরুত্ব দাবি করে। আইএলওর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের তরুণীদের বেকারত্ব তরুণদের তুলনায় অনেক বেশি এবং প্রায় অর্ধেক তরুণী শিক্ষা, চাকরি বা প্রশিক্ষণের বাইরে।


আমাদের দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বড় দুর্বলতা হলো, প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর প্রশিক্ষণার্থীর কী হলো, তার যথেষ্ট হিসাব থাকে না। একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্র কতজনকে প্রশিক্ষণ দিল, এটি সাফল্যের মাপকাঠি হতে পারে না। প্রশিক্ষণ শেষে কতজন চাকরি পেলেন, কতজন আয় বাড়াতে পারলেন, কতজন ব্যবসা শুরু করে টিকিয়ে রাখতে পারলেন, সেটিই হওয়া উচিত প্রকৃত সূচক।


একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাতের সম্পর্ক পুনর্গঠন করতে হবে। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার শেষ বছরে এসে চাকরি খোঁজার বদলে শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই ইন্টার্নশিপ, শিক্ষানবিশি, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রকল্পভিত্তিক কাজ এবং বাস্তব অভিজ্ঞতার সুযোগ দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগগুলোরও নিয়মিতভাবে জানতে হবে, তাদের পাঁচ বছর আগে বের হওয়া শিক্ষার্থীরা কোথায় কাজ করছেন, কোন দক্ষতার চাহিদা বাড়ছে এবং কোন দক্ষতা অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ছে।


কারণ শ্রমবাজার বদলাচ্ছে দ্রুত। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন ও ডিজিটাল প্রযুক্তি আগামী দিনে অনেক কাজের ধরন বদলে দেবে। কিন্তু এর অর্থ কাজ শেষ হয়ে যাওয়া নয়, বরং কাজের প্রকৃতি বদলে যাওয়া। যে তরুণ নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে কাজ করতে শিখবেন, তাঁর জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হবে। যে শিক্ষা ও দক্ষতা ব্যবস্থার বাইরে থাকবেন, তাঁর ঝুঁকি বাড়বে।


এখানে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতেরও বড় দায়িত্ব রয়েছে। কম্পানিগুলোকে শুধু অভিজ্ঞ কর্মী খুঁজলে হবে না, তরুণদের জন্য এন্ট্রি লেভেল চাকরি ও শিক্ষানবিশির সুযোগ তৈরি করতে হবে। সরকার কর-প্রণোদনা বা নীতিগত সহায়তার মাধ্যমে এ ধরনের কর্মসংস্থান উৎসাহিত করতে পারে।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও