উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও দারিদ্র্য পরিস্থিতির অবনতি

যুগান্তর ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী প্রকাশিত: ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ১০:১০

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য মতে, গত সেপ্টেম্বরে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার আগের মাসের চেয়ে দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। আগের মাসে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ। গত ২১ সেপ্টেম্বর সরকার সব ধরনের জ্বালানি তেলের মূল্য লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর পর মূল্যস্ফীতি কিছুটা বেড়েছে। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মানুষের গড় জাতীয় মজুরি বা আয় বৃদ্ধি না পেয়ে বরং কমেছে। গত সেপ্টেম্বরে গড় জাতীয় মজুরির হার ছিল ৭ দশমিক ৯০ শতাংশ। আগের মাসে এটা ছিল ৮ দশমিক ৫ শতাংশ।


বিগত চার বছরেরও বেশি সময় ধরে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে বিদ্যমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে তুলছে। করোনা-উত্তর বিশ্ব অর্থনীতি যখন উত্তরণের পর্যায়ে ছিল, তখন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হয়। এ যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়। দেশে দেশে খাদ্যাভাব দেখা দেয়। অথচ সেই সময় বিশ্বব্যাপী খাদ্য উৎপাদন ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু পরিবহণ জটিলতার কারণে খাদ্যসহ সব ধরনের নিত্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। সেই সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে ৯ দশমিক ১ শতাংশে উন্নীত হয়, যা ছিল দেশটির ৪০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব আমেরিকা উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য অন্যান্য ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি একাধিকবার পলিসি রেট বৃদ্ধি করে। এসব ব্যবস্থা দেশটির মূল্যস্ফীতিকে ধীরে ধীরে সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে সহায়তা করে। ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব আমেরিকার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে বাংলাদেশসহ অন্তত ৭৭টি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের পলিসি রেট বৃদ্ধি করে। আগে বাংলাদেশ ব্যাংকের পলিসি রেট ছিল ৫ শতাংশ। একপর্যায়ে তা বেড়ে ১০ শতাংশে উন্নীত হয়। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক অবশ্য দশমিক ৫০ শতাংশ কমিয়ে পলিসি রেট ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ নির্ধারণ করে। সর্বশেষ মুদ্রানীতিতেও পলিসি রেট ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ বহাল রাখা হয়েছে।


উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হচ্ছে পলিসি রেট বাড়ানো। শিডিউল ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে স্বল্পকালীন ঋণ গ্রহণের সময় যে সুদ প্রদান করে, সেটাই পলিসি রেট বা রেপো রেট। পলিসি রেট বাড়লে শিডিউল ব্যাংকগুলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণের সময় অতিরিক্ত সুদ দিতে হয়। ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব আমেরিকার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে যেসব দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক পলিসি রেট বৃদ্ধি করে, তাদের অধিকাংশই অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে বিদ্যমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিস্ময়কর সাফল্য প্রদর্শন করেছে অর্থনৈতিকভাবে সমস্যাগ্রস্ত দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলংকা। কয়েক বছর আগে শ্রীলংকা আন্তর্জাতিকভাবে ঋণখেলাপি দেশে পরিণত হয়। দেশটির মূল্যস্ফীতির হার ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে ৬৭ দশমিক ৪০ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল। সেখান থেকে তারা পলিসি রেট বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছে। গত সেপ্টেম্বরে শ্রীলংকার মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৮ শতাংশ।


বাংলাদেশ ব্যাংক একাধিকবার পলিসি রেট বৃদ্ধি করে ৫ থেকে ১০ শতাংশে উন্নীত করলেও (বর্তমানে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ) মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কোনো সাফল্য দেখাতে পারেনি। অনেকেই মনে করেন, পলিসি রেট বৃদ্ধি করলেও উল্লেখিত সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক এমন কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করে, যা উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সমস্যা সৃষ্টি করে। বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যায়ক্রমে পলিসি রেট বৃদ্ধি করে ১০ শতাংশে উন্নীত করলেও ব্যাংক ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার অনেক দিন পর্যন্ত ৯ শতাংশে ফিক্সড করে রাখে। সেই সময় কোনো কোনো ব্যাংকের ‘কস্ট অব ফান্ড’ ছিল সোয়া ৮ শতাংশ। সোয়া ৮ শতাংশ ব্যয়ে ফান্ড তৈরি করে তা ৯ শতাংশে বিনিযোগ করা মোটেও লাভজনক ছিল না। ফলে শিডিউল ব্যাংকগুলো ঋণ সংকোচন নীতি গ্রহণ করে। তারা সাধারণ গ্রাহক ও উদ্যোক্তাদের আর আগের মতো অবারিত ঋণদানে আগ্রহী হয় না। এতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার কথা থাকলেও কার্যত তা হয়নি।


ফ্যাসিস্ট সরকারের সমর্থনপুষ্ট ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাগোষ্ঠী ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের ওপর চাপ সৃষ্টি করে ঋণের নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যাংক থেকে বের করে নেয়। ফলে পলিসি রেট বৃদ্ধির মাধ্যমে বাজারে অর্থ সরবরাহ কমানোর প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। ২০২২ সালের মুদ্রানীতিতে ব্যক্তি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৪ দশমিক ১ শতাংশ। বাস্তবে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছিল ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ। বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, সেই সময় কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্য আমদানি কমেছিল ১৪ শতাংশ করে। শিল্পে ব্যবহার্য ক্যাপিটাল মেশিনারিজ আমদানিও ব্যাপকভাবে কমেছিল। তাহলে প্রশ্ন দেখা দেয়, লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ব্যাংকগুলো যে বেশি ঋণ প্রদান করল, তা কোথায় গেল? অর্থনীতিবিদদের অনেকেই অভিযোগ করেন, ব্যাংক থেকে শিল্প-কারখানা স্থাপনের নামে ঋণ নিয়ে তা অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার করা হয়। এ অর্থ কোনো না কোনোভাবে বাজারে চলে এসেছে। ফলে বিরাজমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে কমে আসেনি। অনেকে ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করে তা বিদেশে পাচার করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও