মুখোশের আড়ালে বেসরকারি ‘জনসেবা’

কালের কণ্ঠ ড. আলা উদ্দিন প্রকাশিত: ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ১০:০৯

শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে মুঠোফোনে বা ডেস্কে বসে সমাজের রূঢ় বাস্তবতা বোঝা যায় না। এটি বোঝার জন্য মাটির গন্ধ পেতে হয়, মানুষের চোখের দিকে সরাসরি তাকাতে হয়।

বাংলাদেশে এনজিও খাতের শুরুর দিকটা ছিল ঠিক এমন এক মানবিক আবেগের জায়গা। রাষ্ট্র যখন সব জায়গায় পৌঁছতে পারছিল না, তখন একদল মানুষ আশার আলো হয়ে সামনে এসেছিলেন। তাঁরা দারিদ্র্য দূর করা, শিক্ষা ছড়ানো, নারীর ক্ষমতায়ন ও মর্যাদা বাড়ানো বা মানবাধিকার রক্ষার মতো বড় বড় স্বপ্নের কথা বলতেন। তখন এনজিও মানেই ছিল মানুষের ভরসা আর নৈতিক সাহসের এক প্রতীক।

কিন্তু সময়ের স্রোতে সেই ভরসার জায়গাটি আজ নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। যাঁরা একসময় অধিকারের কথা বলে মানুষকে সংগঠিত করেছেন, তাঁরাই আজ সমাজের ক্ষমতাবান শ্রেণিতে পরিণত হয়েছেন। সাম্প্রতিক অতীতে তাঁদের হাতে যখন নীতিনির্ধারণের ক্ষমতা এলো, তখন দেখা গেল এক অন্য রকম দৃশ্য। এত দিন যে সাম্য ও ন্যায়ের বুলি তাঁরা আওড়েছেন, ক্ষমতার স্বাদ পাওয়ার পর সেসবের কোনো চিহ্নই আর রইল না।

বরং নিজেদের গোষ্ঠীস্বার্থ আর রাজনৈতিক প্রভাব বাড়াতেই তাঁরা বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।


এখানেই শুরু হয় মুখোশ খুলে পড়ার গল্প। এই যে মানুষের কল্যাণ বা উন্নয়নের নামে তাঁরা এত দিন কাজ করেছেন, বাস্তবে তার কতটুকু মানুষের জীবন বদলেছে? মাঠ পর্যায়ে নারীদের সঙ্গে কথা বলা, নারীর মুক্তি ও ক্ষমতায়নের কথা বলা, পরিবেশ নিয়ে বড় বড় সেমিনার করা, দেশজ প্রযুক্তি ও সম্পদ বিকাশের কথা বলা কিংবা প্রান্তিক মানুষের অধিকার নিয়ে উচ্চকণ্ঠ হওয়া—এসবই ছিল এক ধরনের কৌশল। যখন তাঁরা ক্ষমতার শীর্ষে বসলেন, তখন পরিষ্কার হলো যে এসব ছিল মূলত প্রকল্পের ভাষা, ব্যবসার কৌশল। সরকারে না থাকলে এনজিও/শিক্ষকদের বেশ কয়েকজন সরকারের যাবতীয় কর্মকাণ্ডের সমর্থন ও সরকারি কাজের আশকারা দিয়েছেন।

তাঁরা প্রচার করেছেন এক কথা, কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন ঘটেনি একদমই। বরং এনজিওর আড়ালে গড়ে উঠেছে এক নতুন অভিজাত শ্রেণি, যাদের জীবনযাপন সাধারণ মানুষের নাগালের অনেক বাইরে। দামি গাড়ি আর বিলাসবহুল জীবন তাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে, অথচ যাদের নিয়ে তারা কাজ করার দাবি করে, সেই মানুষগুলো আজও দারিদ্র্য আর অবহেলার বৃত্তেই আটকা। এটি শুধু কোনো প্রশাসনিক বিচ্যুতি নয়, এটি একটি গভীর নৈতিক সংকট।


মানুষের বিশ্বাস তৈরি হয় অনেক যত্ন নিয়ে, কিন্তু তা ভাঙতে সময় লাগে না। যখন একজন সমাজকর্মী বা এনজিওর শীর্ষ ব্যক্তি ক্ষমতার সুযোগ পেয়ে নিজের পুরনো কথার উল্টো পথে হাঁটেন, তখন সেই বিশ্বাস মাটির সঙ্গে মিশে যায়। আজ এনজিওর অনেক নেতা গণতন্ত্র ও জবাবদিহির কথা বলেন, অথচ নিজেদের ঘরের ভেতরেই তাঁরা স্বৈরাচারী। দাতা সংস্থার ফান্ড পেতে তাঁরা মানবাধিকারের বড় বড় কথা বলেন, কিন্তু নিজেদের কর্মীদের সঙ্গেই তাঁরা মানবিক আচরণ করতে ব্যর্থ হন। এনজিওর এই যে মানসিক অবক্ষয়, এর শিকড় অনেক গভীরে। আগে তারা ছিল সমাজকেন্দ্রিক, এখন তারা হয়ে গেছে দাতাকেন্দ্রিক। মাঠের মানুষের কী প্রয়োজন, তা জানার চেয়ে বিদেশি দাতা সংস্থার রিপোর্টে কী লিখলে ফান্ড আসবে, সেটিই এখন তাদের মূল লক্ষ্য। এ কারণেই তাদের কাজ এখন আর মানুষের জীবনের সঙ্গে মেলে না, বরং প্রকল্পের সূচকে আটকে থাকে।


এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয়েছে প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর হারিয়ে যাওয়ায়। আগে এনজিওগুলো ছিল সেই অবহেলিত মানুষের মুখপাত্র। আজ তারা হয়ে গেছে এক ধরনের অনুবাদক, যারা দেশের বাস্তবতাকে নিজের মতো করে সাজিয়ে বিদেশি ভাষায় তুলে ধরে। তাদের পৃথিবী এখন অফিসের এসি ঘর, সেমিনার কক্ষ বা আন্তর্জাতিক সম্মেলনের মঞ্চ। ফলে সমাজের আসল ক্ষতগুলো অনুচ্চারিতই থেকে যাচ্ছে। এনজিওগুলো আজ এমন এক বিন্দুতে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে তাদের আর বিকল্প শক্তি বা জনগণের মিত্র বলা যাচ্ছে না। তারা নিজেরাই এখন এক ধরনের রাষ্ট্র বা আমলাতান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে। তারা অন্যদের কাছে জবাবদিহি চাইলেও নিজেরা দায়বদ্ধতা থেকে অনেক দূরে। সাধারণ মানুষ এখন খুব ভালোভাবেই বুঝে গেছে, এনজিওর অনেক মানবিক কাজ আসলে অভিনয়, যা প্রকল্প শেষ হলেই থেমে যায়।


কোনো প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতি যখন তার উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয়, তখন তা এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক যান্ত্রিকতায় রূপ নেয়। এনজিওর ক্ষেত্রেও তা-ই ঘটেছে। তারা এখন আর মানুষের সমাজ বা সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে থাকে না, বরং তারা এখন একেকটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো। এই দ্বীপগুলো একেকটি দাতা সংস্থার ফান্ডের ওপর টিকে থাকে। ফলে মাঠ পর্যায়ে মানুষের যে জীবন, তাদের যে লড়াই, সেগুলোকে তারা শুধু ডেটা বা পরিসংখ্যান হিসেবেই দেখে। এই পরিসংখ্যানের পেছনে যে মানুষগুলো আছে, তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা বা তাদের বেদনার কথা এই এনজিওগুলোর রিপোর্টে খুব একটা উঠে আসে না। মানুষ তখন আর কোনো সত্তা থাকে না, হয়ে যায় প্রকল্পের একটি সংখ্যা মাত্র। এই বস্তুনিষ্ঠতা বা অবজেক্টিফিকেশনই এনজিওগুলোর আসল মানবিকতাকে আড়াল করে ফেলেছে।


অবশ্য আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, এই খাতের সঙ্গে যুক্ত সবার হাতেই কালি মাখানো নেই। এখনো কিছু প্রতিষ্ঠান এবং মাঠ পর্যায়ে অসংখ্য তরুণ ও সমাজকর্মী আছেন, যাঁরা নিঃস্বার্থভাবে মানুষের জন্য কাজ করছেন। তাঁরা প্রচারের আলোতে আসতে চান না, বরং মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়াতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। সমস্যা হলো, এই নিষ্ঠাবান মানুষগুলো কখনোই সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গায় পৌঁছতে পারেন না। নেতৃত্বের আসনটি দখল করে রেখেছে সেই গোষ্ঠী, যারা মাঠকর্মীদের শুধু হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। এখন প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, এই খাত কি পুরোপুরি ব্যর্থ? উত্তর হলো ‘না’। কারণ এনজিওগুলোর ঐতিহাসিক অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু বর্তমানের এই বিচ্যুতি আমাদের জন্য এক বড় সতর্কবার্তা।

সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ুন

প্রতিদিন ৩৫০০+ সংবাদ পড়ুন প্রিয়-তে

আরও