ক্ষমতা বদলায়, ক্ষমতার সংস্কৃতি কি বদলায়
বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘ ইতিহাসে একটি অস্বস্তিকর প্রবণতা বারবার দেখা গেছে, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, প্রশাসন, ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবহণ, বাজার, ভূমি এবং স্থানীয় পর্যায়ের ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোয় নতুন রাজনৈতিক বলয়ের প্রভাব বাড়ে। আগের পক্ষের কিছু মানুষ বাদ পড়ে, নতুন পক্ষের কিছু মানুষ জায়গা করে নেয়; কিন্তু কাঠামোটি প্রায় একই থাকে। যদি এ অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে-আমরা কি কেবল ক্ষমতার মালিক পরিবর্তন করছি, নাকি ক্ষমতার ব্যবহার পদ্ধতিও পরিবর্তন করছি?
রাজনৈতিক পরিচয় যদি থানায় কল করার ক্ষমতা দেয়, ভূমি দখলের নিরাপত্তা দেয়, টেন্ডার পাওয়ার সুবিধা দেয়, বাজার নিয়ন্ত্রণের সুযোগ দেয় কিংবা অপরাধের পর আইনের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার নিশ্চয়তা দেয়, তাহলে সেখানে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। এ কারণেই আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হওয়া উচিত, রাষ্ট্রযন্ত্রে কারা এখনো সক্রিয়?’
একটি সরকার পরিবর্তিত হয়েছে। রাজনৈতিক বাস্তবতারও বড় পরিবর্তন ঘটেছে; কিন্তু রাষ্ট্রের ভেতরের সবকিছু কি সত্যিই বদলেছে? নাকি পুরোনো ক্ষমতার কাঠামোর কিছু অংশ নতুন পরিচয়, নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় এবং নতুন সুবিধাভোগীর সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিয়ে এখনো সক্রিয়? এ প্রশ্নটি এখন আর নিছক রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় নয়। কারণ দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে চাঁদাবাজি, ভূমিদখল, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, ছিনতাই, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতার খবর পাওয়া যাচ্ছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে এমন ঘটনায়ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতার কথা উঠে এসেছে। অর্থাৎ সমস্যা শুধু একটি দলের নয়; বরং আরও গভীর প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশে কি রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন করে ক্ষমতার সুবিধাভোগ করার একটি সংস্কৃতি চলতে থাকবে?
একটি কথা মনে রাখতে হবে, অপরাধ বাড়লে প্রথমে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ। সাম্প্রতিক সময়ে সহিংসতা যে হারে বেড়েছে, তা দেশের নাগরিকের জন্য খুবই উদ্বেগজনক। ২০২৬ সালের প্রথমার্ধের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে হত্যা, নারী ও শিশু নির্যাতন, পুলিশের ওপর হামলা, প্রকাশ্যে গুলি, চাঁদাবাজি ও ছিনতাই নিয়ে উদ্বেগের কথা বলা হয়েছে।
এখানে সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় অপরাধের সংখ্যা যতটা নয়, তার চেয়েও বেশি হলো অপরাধের প্রতি সামাজিক সহনশীলতা তৈরি হওয়া। মানুষ যখন ভাবতে শুরু করে, ‘অভিযোগ করে লাভ নেই’, ‘ওর রাজনৈতিক লোক আছে’, ‘পুলিশ কিছু করবে না’, ‘মামলা হলেও শেষ পর্যন্ত কিছু হবে না’; তখন আইনের প্রতি নাগরিকের আস্থার ঘাটতি বেড়ে যায়। আর আইনকে পাশ কাটিয়ে যখন কিছু মানুষ নিজেরাই বিচার করতে শুরু করে, তখন রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিক মূল্যায়নেও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া নিয়ে উদ্বেগের কথা বলা হয়েছে।
সম্প্রতি হত্যা ও ধর্ষণের পরিসংখ্যান দিতে গিয়ে খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছেন, ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে ২,৩৩২টি হত্যা এবং ৪,৪০২টি ধর্ষণের ঘটনা ‘নথিভুক্ত’ হয়েছে। একই সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা হয়েছে ৯,৩৪৭টি। বেসরকারি সংস্থার পরিসংখানে জানা গেছে, এ বছরের প্রথম ছয় মাসেই ৩৪১ জন নারী ও কিশোরীকে হত্যা হয়েছে। রাজনৈতিক সহিংসতায় ৪১ জন নিহত এবং ৯৭০ জন আহত হয়েছে।’ মব সহিংসতা’য় মৃত্যু হয়েছে ৩৩ জনের।
- ট্যাগ:
- মতামত
- সরকার পরিবর্তন
- ক্ষমতার রাজনীতি