জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কারের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, দুই বছর পর এসে সেই প্রক্রিয়া কোথায় দাঁড়িয়েছে; সংস্কার প্রশ্নে রাজনৈতিক বিতর্ক; বিরোধী দলকে বাদ দিয়ে সংবিধান সংশোধন করলে এর রাজনৈতিক প্রভাব কী হতে পারে—এসব বিষয় নিয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন সাবেক জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ।
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, দুই বছর পর এসে এই সংস্কার প্রক্রিয়াটা কোথায় এসে দাঁড়াচ্ছে?
আলী রীয়াজ: রাষ্ট্র সংস্কারের প্রত্যাশাটা এখনো আছে। আপনি সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলেন, তারা কিন্তু আগের ব্যবস্থায় ফিরে যেতে চায় না। সাধারণ মানুষ হয়তো সুস্পষ্টভাবে আপনাকে সংবিধানের ধারা বলতে পারবে না। কিন্তু তারা এটা বুঝতে পারেন যে যদি আগের মতোই ব্যবস্থাটা থাকে তাহলে ভিন্ন কিছু আশা করা যাবে না। রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতি যে প্রত্যাশা, তার কাঠামো তৈরি হয়েছে। সাধারণ মানুষ এখন বুঝতে পারেন—পরিবর্তনের জায়গাগুলোর মধ্যে সংবিধান, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা বড় বিষয়।
এখন আমার কাছে মনে হচ্ছে, এটাকে বাস্তবায়নের পথে যেভাবে অগ্রসর হওয়া প্রয়োজন ছিল, সেভাবে হচ্ছে না। ভিন্ন পথ খোঁজার চেষ্টা করা হচ্ছে। বড় রকমের সংস্কার ছাড়া ছোটখাটো সংশোধন দিয়ে রাষ্ট্রকাঠামো বদলাবে না। রাষ্ট্রকাঠামো না বদলালে গণতান্ত্রিক উত্তরণ করতে পারবেন না।
আপনি সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান ছিলেন। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে বিভিন্ন দলের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে জুলাই সনদ তৈরি করলেন। লম্বা সময় নিয়ে সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু এখনো বিতর্ক হচ্ছে—কী সংস্কার দরকার, কীভাবে হবে। এখানে সমস্যাটা কোন জায়গায়?
আলী রীয়াজ: জুলাই জাতীয় সনদ তৈরির মধ্য দিয়ে যেসব বিষয় সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে, সেগুলোর ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোর মোটামুটি ঐকমত্য আছে। কিছু কিছু বিষয়ে ভিন্নমত আছে। কিন্তু মূল জায়গা বা মর্মবাণী বিবেচনা করলে এখনকার আলোচনা বা বিতর্ক অনেকটাই অপ্রয়োজনীয়। কারণ এজেন্ডা সুস্পষ্ট। কী করতে হবে, আমরা জানি।
এখন সবটাই আপনি যদি বাস্তবায়ন করতে না চান, তাহলে রাজনৈতিক দলগুলোকে আলোচনা করেই সেটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এটা জনগণের কাছে নেওয়া হয়েছিল। সাত কোটি মানুষ এ বিষয়ে মত দিয়েছে। তাদের মত আপনাকে গ্রাহ্য করতে হবে। ফলে এখনকার বিতর্কটা এই অর্থে অপ্রয়োজনীয়—এজেন্ডা নতুন করে তৈরি করার কিছু নাই। কী করতে হবে আমরা জানি। ফলে এগুলো একদিকে সময়ের ক্ষেপণ, আরেক দিকে মূল জায়গাগুলো থেকে আমরা সরে যাচ্ছি। মূল জায়গাটা হচ্ছে রাষ্ট্রব্যবস্থাকে সংস্কার করে জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা করা।
আপনারা যেসব মৌলিক সংস্কার প্রস্তাব করেছিলেন তার কিছু বিষয়ে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট বা ভিন্নমত ছিল। এই নোট অব ডিসেন্ট এবং বাস্তবায়ন পদ্ধতি—এ দুটি বিষয়ে বিতর্ক আছে। এসব প্রস্তাব তৈরির ক্ষেত্রে কোনো মৌলিক ঘাটতি কি ছিল, যার ফলে এখনো বিতর্ক রয়ে গেল?
আলী রীয়াজ: আমরা মনে করি না। অন্ততপক্ষে আমি প্রক্রিয়ার অংশীদার হিসেবে বলব যে এটার মধ্যে আমরা মৌলিক কোনো ত্রুটি দেখিনি। নোট অব ডিসেন্ট থাকতেই পারে। আদালতের রায়ের ক্ষেত্রে নোট অব ডিসেন্ট থাকলে এটা কি সাময়িকভাবে স্থগিত থাকবে? এটা বাস্তবায়ন হবে। রাজনৈতিক আলোচনায় নোট অব ডিসেন্টের অর্থ হচ্ছে ‘একমত না’। কিন্তু জনগণ যদি আপনাকে বলে দেয় তখন? এটা এমন যদি হতো যে শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর চুক্তির মধ্যেই আছে, তা তো নয়। আমরা আগেই বলেছিলাম, মানুষ যদি না চায় সংস্কার হবে না।
সংস্কার বাস্তবায়নে আমরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের কথা বলেছি। কারণ, যেসব সংশোধনের কথা বলা হচ্ছে, এগুলোতে সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিবর্তন হবে। সেগুলো সুরক্ষার ব্যবস্থা কী আছে? এটা কিন্তু ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় প্রায় সব দল নিঃসন্দেহে বলেছিল যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদকে কিছু অতিরিক্ত ক্ষমতা দিতে হবে। কেননা, বাংলাদেশের বিদ্যমান সংবিধানের মধ্যে আপনি সংসদকে অতিরিক্ত ক্ষমতা দিতে পারেন না।
ওই আলোচনায় বিএনপি কি একমত হয়েছিল বা ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় বিএনপির যে অবস্থান ছিল এখন দলটির অবস্থানে কোনো তফাত কি আপনার চোখে পড়ে?
আলী রীয়াজ: হ্যাঁ, অবশ্যই চোখে পড়ে। ঐকমত্য কমিশনের আলোচনার সময় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদকে কিছু অতিরিক্ত ক্ষমতা দিতে হবে—এ বিষয়ে বিএনপি ভিন্নমত পোষণ করেনি। বিএনপির প্রতিনিধি সালাহউদ্দিন আহমদ খুব সুস্পষ্টভাবেই বলেছিলেন, গণভোটের মধ্য দিয়েই সংসদকে অতিরিক্ত ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে। তিনি এ–ও বলেছিলেন যে গণভোটের মধ্য দিয়ে জনগণের যে অভিপ্রায় প্রকাশিত হবে তার ওপরে কোনো আইনি মর্যাদা নেই, ‘তখন সেটা আমাদের ওপরে বাইন্ডিং হবে।’ তিনি এটিকেই গাঠনিক ক্ষমতা বলেছিলেন।
এখন এই গাঠনিক ক্ষমতা দিতে হলে তো আপনাকে একটা কাঠামো তৈরি করতে হবে। আবার সেই কাঠামো সংসদের বাইরেও যাওয়া যাবে না। সেটারই সমন্বিত রূপ ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’। এটি সীমিত সময়ের জন্য। প্রচলিত সংসদের ক্ষমতাটা থাকবে। নিয়মিত কাজ সংসদকে করতেই হবে। পাশাপাশি যে বিষয়গুলোতে জনগণের সম্মতি পাওয়া গেছে, সেগুলো বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে হবে। সেই বিবেচনায় প্রকৃতপক্ষে এই সংসদকে অতিরিক্ত ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাবে বিএনপির নীতিগত কোনো আপত্তি ছিল না।
কিন্তু বিএনপি সরকার সেটা অনুসরণ করেনি। সংবিধান সংস্কার পরিষদ হয়নি। এখন সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে বিশেষ সংসদীয় কমিটি করা হয়েছে। এটাকে আপনি কীভাবে দেখেন?
আলী রীয়াজ: এটাকে আমি এভাবেই দেখি, বিএনপি যে প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকার করেছিল সেখান থেকে সরে আসছে। কারণ, তারা কিন্তু অতিরিক্ত ক্ষমতা (সংসদকে) দেওয়ার কথা বলেছিল। গণভোটের মাধ্যমেই গাঠনিক ক্ষমতা দেওয়ার কথা বলেছিল।
কিন্তু বিএনপি এটাও বলেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের অন্তহীন প্রতারণার দলিল হচ্ছে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ।
আলী রীয়াজ: আমি তা মনে করি না। যে আলোচনার ভিত্তিতে জুলাই সনদ হয়েছে তার বাইরে গিয়ে আদেশে কিছু নেই। এটাই সিদ্ধান্ত হয়েছিল—সনদে অঙ্গীকার থাকবে, ঐকমত্য থাকবে। বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াটা আমরা আলাদা করব। বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ার আলোচনায় যা যা হয়েছে, তারই প্রতিফলন ঘটেছে আদেশে। সে ক্ষেত্রে এটাকে প্রতারণা কীভাবে বলব আমরা?
ওই আদেশ দেওয়া হয়েছে ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর। নির্বাচন হয়েছে পরের বছর ১২ ফেব্রুয়ারি। অন্তর্বর্তী এই সময়টাতে বিএনপি বা কোনো দল কি আদেশটি প্রত্যাখ্যান করে বলেছিল যে এই আদেশের অধীনে গণভোটে আমরা যাব না? তা তো বলেনি।
- ট্যাগ:
- মতামত
- সংবিধান সংশোধন
- রাষ্ট্র সংস্কার