রোহিঙ্গা সংকটের চেইন-রিঅ্যাকশন
বিশ্বের শরণার্থী সংকটের ইতিহাস-ফিলিস্তিনি, আফগান, সিরিয়ান, বসনিয়ান বা রুয়ান্ডার উদাহরণ-দেখলে একটি কঠিন বাস্তবতা স্পষ্ট হয়, যার নাম সংকটের চেইন-রিঅ্যাকশন। যখন কোনো জনগোষ্ঠী দীর্ঘমেয়াদি শিবির-জীবনে আটকা পড়ে, যখন প্রত্যাবাসনের শর্ত পূরণ হয় না এবং যখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কার্যকর পদক্ষেপ নেয় না, তখন সেই সংকট প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলতে থাকে এবং স্থানীয় সম্প্রদায়, নিরাপত্তা ও অর্থনীতির ওপর গভীর চাপ সৃষ্টি করে। বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণকারী রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কারণে সংকটের নানামুখী ব্যাপ্তি, বৃদ্ধি ও চেইন-রিঅ্যাকশনের আশঙ্কা অমূলক নয়।
নানা গবেষণা ও পর্যবেক্ষণের তথ্যানুযায়ী, যদি রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা সম্ভব না হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে শিবির ব্যবস্থা চালু রাখতে বাধ্য হয়, তবে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বৃহত্তর কক্সবাজারের স্থানীয় সম্প্রদায়ের ওপর চাপ আরও বাড়বে-জমির সংকট, কাঠ ও জ্বালানি সংকট, পরিবেশগত ক্ষয়, অপরাধ ও মাদক বৃদ্ধি, মানব পাচারের ঝুঁকি এবং স্থানীয়-শরণার্থী সম্পর্কের টানাপোড়েন তীব্র হতে পারে। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে গেলে বিপুল রোহিঙ্গার জন্য নানামুখী খরচের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপরও চাপ পড়বে। তা ছাড়া বাংলাদেশের পক্ষে দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও নিরাপত্তা খাতে ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়বে।
প্রসঙ্গত, উখিয়ার ১৭টি শিবিরে ৮১৬ জন রোহিঙ্গার ওপর পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, ৮৭ শতাংশের বেশি রোহিঙ্গা শর্ত পূরণ না হলে মিয়ানমারে ফিরতে চান না। এ সংখ্যাটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়। এটি একটি সম্প্রদায়ের দীর্ঘ নয় বছরের নির্যাতন, অনিশ্চয়তা ও আশা-নিরাশার গল্প। রোহিঙ্গাদের পাঁচটি শর্ত সহজ নয়। এগুলো হলো-নাগরিকত্ব ও স্বীকৃতি। নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক তদারকি। জমি-ঘর ফিরিয়ে দেওয়া ও পুনর্বাসন। চলাচলের স্বাধীনতা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জীবিকাসহ মৌলিক সেবা নিশ্চিত করা। বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের গবেষণা জরিপে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আস্থার প্রশ্ন। ৫৬ শতাংশ রোহিঙ্গা বাংলাদেশ সরকারকে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাসযোগ্য হিসাবে উল্লেখ করেছে। এর পরের অবস্থানে জাতিসংঘ, প্রায় ২১ শতাংশ রোহিঙ্গা জাতিসংঘের ওপর আস্থা প্রকাশ করেছে। মাত্র ৪ শতাংশ মিয়ানমার সরকারকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করে। প্রায় ১৬ শতাংশ জানিয়েছে, তারা কোনো প্রতিষ্ঠানকেই বিশ্বাস করে না। এ সংখ্যাগুলো কী বলছে?
প্রথমত, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ সরকারকে তুলনামূলক বেশি বিশ্বাস করে। এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের ভূমিকা অনস্বীকার্য। রোহিঙ্গারা যদি বাংলাদেশ সরকারের ওপর আস্থা না রাখত, তবে শিবির ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা ও মানবিক সহায়তা এতদিন টিকত না।
দ্বিতীয়ত, জাতিসংঘের ওপর আস্থা ২১ শতাংশ। এটি কম নয়, কিন্তু পর্যাপ্তও নয়। কারণ প্রত্যাবাসনের আন্তর্জাতিক তদারকির দায়িত্ব মূলত জাতিসংঘের। রোহিঙ্গারা যদি জাতিসংঘের ওপর পূর্ণ আস্থা না রাখে, তবে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক গ্যারান্টির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়।
তৃতীয়ত, মাত্র ৪ শতাংশ মিয়ানমার সরকারকে বিশ্বাস করে। এটি সবচেয়ে উদ্বেগজনক। কারণ প্রত্যাবাসন মানেই হলো মিয়ানমারে ফিরে যাওয়া। যদি রোহিঙ্গারা মিয়ানমার সরকারের ওপর আস্থা না রাখে, তবে প্রত্যাবাসন কীভাবে সম্ভব?
চতুর্থত, ১৬ শতাংশ কোনো প্রতিষ্ঠানকেই বিশ্বাস করে না। এটি নির্দেশ করে যে, একটি উল্লেখযোগ্য অংশের মধ্যে হতাশা ও অবিশ্বাসের গভীরতা কতটা।
তা ছাড়া, বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি প্রবণতা চোখে পড়ে। যেমন, মিয়ানমার বর্তমানে গৃহযুদ্ধে জর্জরিত। সামরিক জান্তা দেশের বেশির ভাগ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। রোহিঙ্গাদের আবাসস্থল সাবেক আরাকান ও বর্তমান রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির (এএ) প্রভাব বাড়ছে। কিন্তু আরাকান আর্মিও রোহিঙ্গাবিরোধী অবস্থান থেকে সরে আসেনি। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মিয়ানমার সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মি-উভয়পক্ষই রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গুরুতর নির্যাতনের অভিযোগে অভিযুক্ত। সেখানে চলাচলে নিষেধাজ্ঞা, যথেচ্ছ আটক, জোরপূর্বক নিয়োগসহ নানা নিপীড়ন চলছে। এ পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন কীভাবে সম্ভব? মিয়ানমার সরকার যদি নাগরিকত্ব দিতে না চায়, নিরাপত্তা গ্যারান্টি না দেয় এবং জমি ফিরিয়ে না দেয়, তবে প্রত্যাবাসন শুধু কাগজে-কলমে বা মুখে মুখে থাকবে।
হতাশার বিষয় হলো, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মোটেও পর্যাপ্ত নয়। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ ও সংস্থা মৌখিক সমর্থন দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ সীমিত। রোহিঙ্গারা যদি জাতিসংঘের ওপর পূর্ণ আস্থা না রাখে, তবে আন্তর্জাতিক তদারকির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। আর মিয়ানমার সরকার যদি আন্তর্জাতিক চাপে না নড়ে, তবে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আটকে থাকবে। ফলে সমাধানের দিকটি তিনটি সম্ভাবনার ওপর নির্ভর করছে এবং প্রতিটি সম্ভাবনার পেছনে নির্দিষ্ট যুক্তি ও তথ্য রয়েছে। প্রথম সম্ভাবনা হলো শর্তসাপেক্ষ প্রত্যাবাসন-যদি মিয়ানমার সরকার নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, জমি ফেরত ও মৌলিক অধিকারের গ্যারান্টি দেয় এবং আন্তর্জাতিক তদারকি নিশ্চিত হয়, তবে একটি অংশ রোহিঙ্গা ফিরে যেতে পারে; কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি কল্পনাতীত, কারণ মিয়ানমারে চলমান গৃহযুদ্ধ, রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির প্রভাব এবং রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে চলমান নির্যাতনের কারণে নিরাপত্তা গ্যারান্টি দেওয়ার পরিস্থিতি নেই।
- ট্যাগ:
- মতামত
- শরণার্থী
- প্রত্যাবাসন
- রোহিঙ্গা ইস্যু