অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের সন্ধানে বাংলাদেশ
প্রায় একশ বছর আগে বার্ট্রান্ড রাসেল সতর্ক করেছিলেন, অর্থনৈতিক শক্তি কখনো কখনো রাজনৈতিক স্বাধীনতার অন্তর্নিহিত অর্থকে দুর্বল করে দিতে পারে। ১৯২২ সালে প্রকাশিত The Problem of China গ্রন্থে তিনি দেখিয়েছিলেন, বিদেশি আর্থিক স্বার্থ কোনো দেশের ওপর অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তার করলে দেশটি বাহ্যিকভাবে রাজনৈতিক দিক থেকে স্বাধীন থাকলেও তার অর্থনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে। রাসেল চীনের একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ঐতিহাসিক বাস্তবতা নিয়ে লিখেছিলেন। তার বক্তব্যকে একুশ শতকের বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সরাসরি প্রয়োগ করা যায় না। তবু তার বক্তব্যের অন্তর্নিহিত প্রশ্নটি আজও প্রাসঙ্গিক : কোনো দেশ যদি অতিরিক্তভাবে বহিরাগত অর্থনৈতিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে তার রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব কতটা অর্থবহ থাকে? প্রশ্নটি বাংলাদেশের জন্য নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য প্রশ্ন : ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র পারস্পরিক বাণিজ্যসংক্রান্ত একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শিল্প ও কৃষিপণ্যের জন্য উল্লেখযোগ্য অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ১৯ শতাংশ পারস্পরিক শুল্কহার নির্ধারণ করেছে এবং নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে শূন্য পারস্পরিক শুল্কের ব্যবস্থা রেখেছে। চুক্তিটি বাংলাদেশে স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। সমর্থকদের বক্তব্য হলো, এর ফলে বাংলাদেশের যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশাধিকার, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সুযোগ এবং দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্কের পূর্বানুমানযোগ্যতা বাড়তে পারে। সমালোচকরা বাংলাদেশের দেওয়া বিভিন্ন ছাড় এবং তার দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। বিষয়টিকে স্লোগানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব প্রশ্নগুলো সামনে আনা জরুরি। এ চুক্তির ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি কি আরও প্রতিযোগিতামূলক হবে? দেশীয় শিল্প কি প্রযুক্তি ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পাবে? কর্মসংস্থান ও মজুরি কি বাড়বে? চুক্তিটি কি বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বহুমুখী করবে, নাকি একটি বড় বিদেশি বাজারের ওপর নির্ভরতা আরও বাড়াবে? রাসেলের পুরোনো সতর্কবাণী এখানেই নতুন প্রাসঙ্গিকতা লাভ করে।
অর্থনৈতিক শক্তি ও রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব : বিদেশি বাণিজ্য ও বিনিয়োগ মানেই অর্থনৈতিক আধিপত্য নয়। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য মূলধন, প্রযুক্তি, বাজার এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অপরিহার্য। বিদেশি বিনিয়োগ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে, উৎপাদনশীলতা বাড়াতে এবং দেশীয় উৎপাদকদের বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে পারে। সমস্যা দেখা দেয় যখন বিকল্পের সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত হয়ে পড়ে। কোনো দেশ যদি রপ্তানির জন্য একটি বাজার, প্রয়োজনীয় কাঁচামালের জন্য একমাত্র সরবরাহকারী, জ্বালানির জন্য একটি উৎস অথবা অর্থায়নের জন্য একটি বিশেষ গোষ্ঠীর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে বহিরাগত চাপ ও অর্থনৈতিক অভিঘাতের কাছে দেশটির ঝুঁকি বেড়ে যায়। অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের অর্থ তাই বলে বিচ্ছিন্নতা নয়। এর অর্থ হলো-একটি দেশের নিজস্ব উৎপাদনক্ষমতা ও বৈচিত্র্যময় আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এতটাই শক্তিশালী হওয়া, যাতে কোনো একটি বাইরের শক্তির ওপর দেশটি অতিরিক্ত নির্ভর না করে সে নিজের জাতীয় স্বার্থে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে।
ভারত ও আঞ্চলিক নির্ভরতা : ঠিক এ নীতিই বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের অর্থনৈতিক সম্পর্ক নির্ধারণে প্রযোজ্য। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ব্যাপক অর্থনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক এবং উভয় দেশের জন্যই উপকারী। বাংলাদেশের জন্য তুলা, সুতা, কাপড়, যন্ত্রপাতি, খাদ্যপণ্য এবং বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামালের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হতে পারে ভারত। বাংলাদেশি অনেক উৎপাদক এসব ভারতীয় পণ্যের ওপর নির্ভর করেন, কারণ এগুলো তুলনামূলকভাবে প্রতিযোগিতামূলক দামে এবং সহজে পাওয়া যায়। তবে দুই দেশের বাণিজ্য ভারসাম্য নিয়ে উদ্বেগও যথেষ্ট। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ ভারত থেকে প্রায় ১০.৯৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে, বিপরীতে ভারতে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল প্রায় ১.৭৫ বিলিয়ন ডলার। এ বিপুল বাণিজ্য ঘাটতি এককভাবে অর্থনৈতিক আধিপত্যের প্রমাণ নয়। উৎপাদনক্ষমতার পার্থক্য, অভ্যন্তরীণ চাহিদা, ভৌগোলিক অবস্থান এবং শিল্পের প্রয়োজনীয়তার মতো বিভিন্ন কারণ বাণিজ্য ঘাটতি সৃষ্টি করতে পারে। আবার বাংলাদেশি শিল্পও ভারতীয় কাঁচামাল ও শিল্প-উপকরণ থেকে বাস্তব সুবিধা পেয়ে থাকে। অতএব মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত-বাংলাদেশ কীভাবে নিজের উৎপাদনক্ষমতা বাড়িয়ে এবং রপ্তানি সম্প্রসারণ করে দুই দেশের সম্পর্ককে ক্রমশ আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও পারস্পরিকভাবে লাভজনক করে তুলতে পারে।
আমেরিকাবিরোধী বা ভারতবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি সঠিক নয় : রাসেলের বক্তব্যকে আমেরিকা বা ভারতের বিরুদ্ধে যুক্তি হিসাবে ব্যবহার করা সমীচীন নয়। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, চীন, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, উপসাগরীয় দেশসহ অনেক দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক দরকার। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বাজার; ভারত গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক অর্থনৈতিক অংশীদার এবং শিল্পের কাঁচামালের অন্যতম বড় উৎস। সুতরাং কোনো একটি দেশের বিরুদ্ধে অন্য একটি দেশকে বন্ধু হিসাবে বেছে নেওয়া উচিত নয়; বরং কোনো একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এড়িয়ে চলাই সঠিক নীতি। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, জ্বালানি ও অর্থায়নের ক্ষেত্রে যত বেশি বিকল্প থাকবে, বাংলাদেশের দরকষাকষির ক্ষমতাও তত বাড়বে।
- ট্যাগ:
- মতামত
- বৈদেশিক বাণিজ্য
- অর্থনৈতিক
- সার্বভৌমত্ব